শনিবার, ২৮ নভেম্বর ২০২০, ০৫:৩৪ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম :
বেতন বৈষম্য নিরসনের দাবীতে ভাঙ্গায় স্বাস্থ্য সহকারীদের কর্মবিরতি ও মানববন্ধন হযরত শাহ কবির (রহঃ) ৪০০ বছরেও অমলিন চুয়াডাঙ্গার গবেষক আমানতের নতুন কিছু মিরপুরের সাবেক এমপি মরহুম আলহাজ্ব হারুন-অর-রশিদ মোল্লার ২৮তম মৃত্যু বার্ষিকী পালিত চেয়ারম্যানের উপর হামলা : জেলাজুড়ে বাস বন্ধ করে অভিযুক্তদের গ্রেফতার দাবি বরগুনায় যুবলীগ নেতা ইউপি চেয়ারম্যানকে কুপিয়ে গুরুতর জখম সাভার হেমায়েতপুরে সড়ক দুর্ঘটনায় এক যুবক নিহত মিরপুর প্রেসক্লাবে দিনব্যাপী উন্নয়ন সাংবাদিকতার কর্মশালা অনুষ্ঠিত বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের শ্রদ্ধা নিবেদন বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে কলাবাগান থানা ছাত্রলীগের শ্রদ্ধা নিবেদন 
রংপুরে নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়ন নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড়!

রংপুরে নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়ন নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড়!

এনামুল হক স্বাধীন, রংপুর
আইন লঙ্ঘন করে পাতানো নির্বাচনের পর ক্ষমতায় আসা নেতাদের কর্মকাণ্ডে বিস্তর অভিযোগ উঠেছে। শ্রম প্রশাসনের দেয়া নির্বাচন সংক্রান্ত চিঠি গায়েব করে অবৈধভাবে ইউনিয়নের কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। এমন ঘটনা ঘটেছে রংপুর বিভাগীয় শহর ইমারত নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়নের ভেতর-বাইরে। জানা গেছে, গত বছরের ২৪ ডিসেম্বর সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয় রংপুর বিভাগীয় শহর ইমারত নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়নের (রেজি নং রাজ-৮১৮)। ওই সভায় শ্রম অধিদপ্তর, রংপুর কার্যালয়ের অফিস প্রধান স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন। সভায় সাব-কন্ট্রাক্টর গোলাম মোস্তফা লেবুকে নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক করা হয়। আর এই ব্যক্তিকে অতীত নির্বাচনেও নির্বাহী কমিটি একই পদে মনোনীত করেছেন। গঠিত আহবায়ক কমিটি দায়িত্ব নিয়ে গত ৫ জানুয়ারি একটি নির্বাচনী তফশীল ঘোষনা করে। এতে চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি নির্বাচনের ভোট গ্রহণের দিন ধার্য করে। ঘোষিত তফশীলে খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ বা প্রদর্শনের কোন ব্যবস্থা রাখা নাই। এরপর হটাৎ ভোটগ্রহনের তারিখ পরিবর্তন করে ৩১ জানুয়ারির বদলে ২৪ জানুয়ারি নির্ধারন করা হয়। নির্ভরযোগ্য সুত্র জানায়, বিগত ২০১৮ সালের হিসাব বিবরণীতে ২ হাজার ৪শ’ সদস্য সংখ্যা উল্লেখ করেন। অথচ চলতি বছরের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ৪ হাজার ৯৬ জন ভোটার সংখ্যা দেখানো হয়। নির্বাচনের আগের দিন ভোটার তালিকা প্রার্থীদের হাতে সরবরাহ করা হয়েছে। পরেরদিন ভোটের মাঠে মাদ্রাসা’র ছাত্রের হাতে ইউনিয়নের পরিচয়পত্র থাকায় একাধিক প্রার্থীর হাতে তাদের আটকের ঘটনাও ঘটেছে। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে শ্রম অধিদপ্তর, রংপুর কার্যালয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দাখিল করে ১১জন। অভিযোগ মাথায় নিয়ে তরিঘরি করে নির্বাচন পরিচালনা কমিটি নির্বাচন পরবর্তী বিতর্কিত কমিটিকে তরিঘরি দায়িত্বভার অর্পন করে। এদিকে, অভিযোগের প্রেক্ষিতে শ্রম অধিদপ্তর রংপুর কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আঃ লতিফ সরকার ও শ্রম কর্মকর্তা কে এম শহিদের সমন্বয়ে ২ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে রংপুর আঞ্চলিক অফিসের শীর্ষ কর্মকর্তা। অভিযোগের বিষয়সমূহ সরেজমিন তদন্ত করে কমিটির সদস্যরা। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা মেলে, তদন্ত কমিটি রংপুর কার্যালয়ের উপ-পরিচালক ও রেজিষ্ট্রার অব ট্রেড ইউনিয়ন্স বরাবর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে চলতি বছরের ১০ মার্চ শ্রম অধিদপ্তর রংপুর কার্যালয়ের রেজিষ্ট্রার অব ট্রেড ইউনিয়ন্স স্বাক্ষরিত (স্মারক নং ১৭৩) গত ২৪ জানুয়ারী অনুষ্ঠিত নির্বাচন ১৭ সদস্য বিশিষ্ট কার্যনির্বাহী কমিটির নির্বাচনী ফলাফল রেজিষ্ট্রার্ড গঠনতন্ত্রের ১১ ধারা এবং বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা -২০১৫ এর বিধি ১৬৯ (১) পরিপন্থী হওয়ায় ইউনিয়নটির মেয়াদ উত্তীর্ণ কমিটিকে আগামী ৩০ দিনের মধ্যে পুন:নির্বাচনের ব্যবস্থা করার জন্য পত্র দেয়। এরই মধ্যে বিশ^ব্যাপী তথা বাংলাদেশজুড়ে ধেঁয়ে আসে কোভিড-১৯। করোনাকালে শ্রমিক সদস্যদের পাশে উল্লেখজনকভাবে না দাঁড়ালেও আগষ্ট হতে অক্টোবর পর্যন্ত নেতারা ইউনিয়নটির পরিচয়পত্র নিতে বাধ্য করেছেন সদস্যদের। করোনাকালের এই দুঃসময়ে শ্রমিকদের ভুল বুঝিয়ে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার পরিচয়পত্র বিক্রয় করেন। প্রতি পরিচয় পত্রের মূল্য ধার্য করা হয়েছে, ২হাজার টাকায় হেডমিস্ত্রি, ৫শ’ টাকায় মিস্ত্রি, ২শ’ টাকা সহকারীদের ক্ষেত্রে আদায় করা হয়েছে। শ্রম বিশেষজ্ঞ ও একাধিক শমিক নেতা মনে করছেন, ইউনিয়নটির নেতারা করোনাকালেই সদস্যদের মাঝে পরিচয়পত্র বিক্রি করে প্রায় ৪০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। পরিচয়পত্র গ্রহণ না করলে সাইডে কাজ করতে দিবে না এমনটাই মনোভাব প্রকাশ করছেন শ্রমিকরা। শ্রম প্রশাসনের প্রেরিত পত্রের বিষয়টি ভুক্তভোগী অভিযোগকারিরা জানেন না। বরং অভিযোগকারিদের মধ্যে সাবেক একজন সাধারণ সম্পাদক জানতে পারেন, অভিযোগের বিষয়ে কি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে? এ বিষয়ে গত ২৮ অক্টোবর শ্রম অধিদপ্তর রংপুরে এক লিখিত অভিযোগ দাখিল করে।
অভিযোগকারিগণ পত্রের অনুলিপি পাওয়া না পাওয়া সম্পর্কে লুকোছাপা’র বিষয়টি মানতে নারাজ শ্রম অধিদপ্তর, রংপুর কার্যালয়ের কর্মকর্তাগণ। রংপুর কার্যালয়ের শীর্ষ ও অধস্থন কর্মকর্তার সাথে আলাপচারিতায় তারা বলেছেন, নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহবায়ক, কমিটির সভাপতি/ সম্পাদক কে পত্র পাঠানো হয়েছে ইউনিয়নের ঠিকানায়। পত্রের অনুলিপি অভিযোগকারিকেও দেওয়া হয়েছে ইউনিয়ন কার্যালয়ের ঠিকানায়। পত্রগুলো ইউনিয়নের ঠিকানায় যাওয়ার কারণে, হয়তো সব চিঠিই ইউনিয়ন কর্মকর্তারা গ্রহণ করে গোপন করেছেন। বাংলাদেশ শ্রম আইন ধারা ২-এর ৪৯ (চ) উপধারা মতে তারা মালিকের সংজ্ঞাভুক্ত। ইউনিয়নটির কর্মপরিধি রংপুর সিটি কর্পোরেশনের অঞ্চলভিত্তিক। তারা ব্যক্তি স্বার্থে জেলা ব্যাপি এর কার্যক্রম বিস্তৃত করেছেন। সাব-কন্ট্রাক্টর দিয়ে নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করে বারবার নির্বাচনে জিতে আসা, আর বর্তমান শ্রম অধিদপ্তরের পত্র ছাপিয়ে যাওয়ার সুযোগ নিয়েছেন। চলতি বছরের ১০ মার্চ পুন:নির্বাচন করার পত্র পাওয়ার পরও পূর্বের কমিটিকে ক্ষমতা হস্তান্তর না করার বিষয়টি রহস্যজনক হয়ে উঠেছে। চিঠি নিয়ে শ্রম প্রশাসন ও প্রতিনিধিদের মধ্যে হচ্ছে বাক-বা-কুম খেলা। প্রেরিত চিঠির বেঁধে দেয়া সময়সীমা শেষ হয়েছে। করোনাকাল ব্যতিরেখেও অনেক কার্যদিবস অতিবাহিত হয়েছে, কার্যত: পদক্ষেপ নেয়া নিয়ে গড়িমসির বিষয়টি কি আইন ও বিধিমালা পরিপন্থী নয়? দায়িত্বে অবহেলার বিষয়টি শ্রম প্রশাসনের দেখা দরকার বলে ট্রেড ইউনিয়নের একাধিক নেতৃবৃন্দ দাবি তুলেছেন।
অপরদিকে, ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মাহাতাব উদ্দিন কাজল পেশায় একজন সাব-কন্ট্রাক্টর। সভাপতিসহ আরও অনেকে তাই। ইতিপূর্বের দায়িত্বে আসা নেতাদের মধ্যে অধিকাংশই সাব-কন্ট্রাক্টর। অনেকেই সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিজের কিংবা নিজ পরিবারের সদস্যদের নামে করা লাইলেন্সের বিপরীতে ঠিকাদারি কাজ ভাগিয়ে নিয়ে কাজ করছেন। চারতলা ভবন ও অঢেল সম্পদের পাহারও গড়ার একাধিক নজির রয়েছে সংগঠনটির দায়িত্ব পালনকারি সাবেক নেতাদের মধ্যে। এই সব নেতাদের চলন-বলন দেখলে মনে হবে হবে না যে, তারা অঢেল সম্পদের মালিক বনে গেছেন। এরমধ্যে একাধিক নেতা রয়েছেন যিনি হজ¦ব্রত পালনও করেছেন। সাংবাদিক সখ্যতাও রেখে চলেন সুযোগ-সন্ধানী নেতারা। সাংবাদিক নেতা দ্বারে লোকদের কাছেও যাতায়াত রয়েছে হরহামেশায় কথিত নেতাদের। হকের গলি, নজিরেরহাট, পশ্চিম নীলকণ্ঠ, সিও বাজার কেল্লাবনসহ বিভিন্ন এলাকায় তাদের বসত বাড়ি। এসব নেতাদের প্রতি দুদকের নজরদারি প্রয়োজন।
এ ব্যাপারে, ইউনিয়নটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ঢালী বলেন, শ্রম অধিদপ্তরে অভিযোগ করেছিলাম। রংপুর কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক ও একজন শ্রম কর্মকর্তা অভিযোগের বিষয়সমূহ সরেজমিন তদন্ত করেছেন। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পায়। কিন্তু পরবর্তীতে কি পদক্ষেপ নিয়েছে লেবার অফিস তা জানাননি। এজন্য আবার আমরা একটি পত্র দিয়েছি। নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক গোলাম মোস্তফা লেবু বলেন, সব উপজেলাতেই ট্রেড ইউনিয়নটির সদস্য আছেন। নির্বাচনের দিন লেবার অফিসের লোকজন উপস্থিত ছিল। তাদের উপস্থিতিতেই নির্বাচনের ভোট গ্রহণ হয়েছে। কিছু জানতে চাইলে তাদের (শ্রম অফিসের) কাছে জানেন। এখানে আমাদের কিছু করার নেই। শ্রম দপ্তরের প্রেরিত ১০ মার্চের চিঠি প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, কোন চিঠি আমি পাইনি আর আমি কমিটির কাছে দায়িত্ব আগেই বুঝে দিয়েছি। তারা (প্রতিনিধি) যদি চিঠি নিয়ে আমাকে না জানায় তাহলে তো কিছু করার নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি। এদিকে, ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মাহাতাব উদ্দিন কাজল বলেন, শ্রম অফিসের লোকজনের পরামর্শেই নির্বাচন হয়েছে, আমরা নির্বাচিত কমিটি দায়িত্ব নিয়ে কাজ করছি। আমরা চিঠিও পাই নাই। আপনারা (সাংবাদিক) শ্রম অফিসের সাথে কথা বলেন। আমরা শ্রমিকদের কার্ড দিয়েছি, সামান্য টাকার বিনিময়ে। কাজ চালিয়ে আসছি বলে মন্তব্য করেন তিনি। এ ব্যাপারে, রংপুর আঞ্চলিক অফিসের উপ-পরিচালক ও রেজিষ্ট্রার অব ট্রেড ইউনিয়ন্স মোহাম্মদ সাদেকুজ্জামান মোবাইল ফোনে বলেন, বিষয়টি নিয়ে অপনি ছাড়াও অনেক সাংবাদিক আমাকে ফোন করেছে। বিষয়টা একটু বলেন। ইউনিয়নটির ফাইলটি আমার সামনে নেই। ফাইলটি দেখে ২/১ দিনের মধ্যে জানাতে পারবো বলে মন্তব্য করেন তিনি। অপরদিকে, শ্রমিকের সুরক্ষা দিতে রয়েছে শ্রম আইন ও প্রশাসন। অথচ শ্রম প্রশাসনের চোখের সামনে মলিক সংজ্ঞাভুক্ত লোকজনই ট্রেড ইউনিয়নের নেতা হওয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন একাধিক শ্রম আইন বিশেষজ্ঞরা।

খবরটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© All rights reserved 2018 khoborbangladesh.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com