বৃহস্পতিবার, ১৭ Jun ২০২১, ১১:৩৮ পূর্বাহ্ন

গাজীপুরে মাদ্রাসা সুপারের দায়িত্বহীনতায় ৪৬ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যত শিক্ষাজীবন অনিশ্চিত

গাজীপুরে মাদ্রাসা সুপারের দায়িত্বহীনতায় ৪৬ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যত শিক্ষাজীবন অনিশ্চিত

আরিফ খান ,গাজীপুর প্রতিনিধি
দিন বদলের বইছে হাওয়া, শিক্ষাই আমার প্রথম চাওয়া।’ শিক্ষার আলো ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে সরকার যখন এমন মন্ত্র দিয়ে পড়ালেখায় গড়ে তুলতে উজ্জীবিত করছেন শিক্ষার্থীদের জীবন, ঠিক তখনই জীবন গড়ার স্বপ্ন থেকে ছিটকে পড়ার উপক্রম হয়েছে গাজীপুর সদর উপজেলার হোতাপাড়ার মনিপুর মোস্তাফিয়া দাখিল মাদ্রাসার ৪৬জন’ শিক্ষার্থীর জীবন। নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে এবার জেএডিসির (অষ্টম) সমাপনি পরীক্ষা দেয়ার কথা থাকলেও সারা বিশ্বব্যাপী মহামারি করোনার কারণে ২০২০ সালে আর বসতে পারেনি জেএডিসির ফাইনাল পরীক্ষার আসনে কোন শিক্ষার্থী । তার ব্যতিক্রম হয়নি মনিপুর মোস্তাফিয়া দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও।
সরকার ঘোষিত দিন তারিখ অনুয়াযী জেএডিসি অর্থাৎ দাখিল অষ্টম শ্রেণির রেজিস্ট্রেশন বাবদ বোর্ড পরীক্ষার ৪৬ জনের নিকট থেকে নির্ধারিত ফি গ্রহণ করেন প্রিন্সিপাল একেএম আব্দুর রহমান।কিন্তু নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্য তিনি সরকারি নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করে ও জেএডিসির সরকারি রেজিস্ট্রিশন ও পরীক্ষা ফি ছাড়াও অতিরিক্ত অর্থ শিক্ষার্থীদের নিকট থেকে আদায় করেছেন সুপার আব্দুর রহমান। তারপরও এসব কোমলমতি শিক্ষার্থীদের নিকট থেকে টাকা নিয়ে বোর্ড কর্তৃক নির্ধারিত তারিখে সরকারি কোষাগারে এদের রেজিস্ট্রেশন ফি জমা দেন নি তিনি।
এদিকে ২০২০ সালে সরকার কর্তৃক স্বয়ংক্রিয় (অটোপাশ) পাশের ঘোষণা আসায় শিক্ষার্থীদের অভিভাবক তাদের সন্তানদের পাশের সনদের জন্য গেলে প্রথমে দেই দিচ্ছি করে কালক্ষেপণ করলেও পরবর্তীতে তিনি ধরা পড়ে যান রেজিস্ট্রিশন করতে না পারার বিষয়টি । এমনকি এদের হাতে দিতেও পারেননি রেজিস্ট্রিশন সনদ বা স্বয়ংক্রিয় পাশের (অটোপাশ) উত্তীর্ণের কোন সনদ।
সূত্রের দাবি, শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রিশন ফি এর টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার কথা থাকলেও সুপার ঢুকিয়েছেন নিজের পকেটে। সুচতুর সুপার নিজেকে আত্মরক্ষার জন্য এক বছর পেরিয়ে গেলে নতুন বছর ২০২১ সালে নবম শ্রেণিতে ভর্তি করে নতুন বইও তুলে দেন শিক্ষার্থীদের হাতে। মনিপুর মোস্তাফিয়া দাখিল মাদ্রাসার অষ্টম শ্রেণী থেকে অটোপাশ হওয়ার কোন সনদ এদের নামে নিবন্ধন হয় নি। তা সত্বেও এদের নবম শ্রেণীতে ভর্তি ও নতুন বই বিতরণ করা হয়েছে। এবিষয়ে জানতে চাইলে সুপার একেএম আব্দুর রহমান বলেন, এদের অটোপাশের সনদের বিষয়ে শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের সাথে কথা হয়েছে। তিনি সব ব্যবস্থা করে দিবেন বলে আশ্বস্থ করেছেন। পাশের সনদ ছাড়া নবম শ্রেণিতে ভর্তি ফি গ্রহণ ও বই বিতরণ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি এ বিষয়ে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
এ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের অভিভাবকগণ মাদ্রাসা প্রধানের (সুপার) সাথে একাধিকবার দেখা করার পরও জেএডিসি পরীক্ষার অটোপাশের সনদ বা রেজিস্ট্রিশনের বিষয়ে আশ্বাস না পেয়ে সন্তানের ভবিষ্যত নিয়ে দুঃশ্চিন্তার মধ্যে পড়েছেন। তারা চোখে অন্ধকার দেখছেন।
এমনকি অষ্টম শ্রেণি থেকে যারা ভালো গ্রেডিং পয়েন্ট পেয়ে নবম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হওয়ার কথা এবং ভালো ফলাফলের আশাবাদি ছিলেন তাদের ভবিষ্যত পড়ালেখা এখন প্রায় অনিশ্চিত। শিক্ষার্থীরা পড়েছেন মহাবিপর্যয়ে।সবচেয়ে বেশি বেকায়দার পড়েছে ২০২০ সালে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া গরীব অসহায় পরিবারের সন্তানেরেরা। এ নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় অভিভাবকগণ। শিক্ষার আলো থেকে তাদের সন্তানরা বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের মা-বাবা সুপারের সাথে কথা বলতে গেলে তাদের সাথে অসদাচরণ করেছেন বলে তারা জানান। এমনকি এসব নিয়ে বাড়াবাড়ি করলে তার পরিনতি ভালো হবে না মর্মে সুপার হুমকি দিয়েছেন বলে তারা জানিয়েছেন।
এ ব্যাপারে ক্ষোভ প্রকাশ করে নাম প্রকাশ না করার শর্তে মনিপুর মোস্তাফিয়া দাখিল মাদ্রাসার একজন সিনিয়র শিক্ষক জানান, এটি মর্মান্তিক ও দুঃখজনক ঘটনা। শিক্ষার্থীদের জীবন চরম অনিশ্চিয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছেন সুপার মহোদয়। তিনি আরও বলেন, সঠিক সময়ে যদি অষ্টম শ্রেণিতে শিক্ষার্থীদের ফি জমা করে রেজিস্ট্রেশন করা হতো তাহলে আজ এ ট্র্যাজেডি হতো না। ছাত্র-ছাত্রীদের জীবন সংকটের মুখে পড়তো না।
মনিপুর মোস্তাফিয়া দাখিল মাদ্রাসার সভাপতি ও ভাওয়ালগড় ইউনিয়ান আওয়ামীলীগ নেতা মো. লিটন মিয়া জানান,মাদ্রাসার ছাত্র-ছাত্রীদের রেজিস্ট্রেশন যে করা হয় নি এ বিষয়টি সুপার আমাকে অবগত করেন নি। তারপরও আমি বিষয়টি জানার পরে শিক্ষার্থীদের জীবন থেকে যেন একটি বছর নষ্ট না হয় তার জন্য শিক্ষা উপমন্ত্রী নওফেল আহমেদ মহোদয়ের সাথে কথা বলেছি। উপমন্ত্রী মহোদয় আমাকে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন পুনরায় রেজিস্ট্রেশন করা কোন অবস্থাতেই সম্ভব নয়।এর দায়ভার মাদ্রাসা সুপারকেই নিতে হবে বলে দাবি করেন লিটন মিয়া।
মাদ্রাসা সুপার একে এম আব্দুর রহমান জামাত ইসলামের রোকন। এমনকি তিনি তার নিজের মালিকানাধীন (করইতলী মডেল একাডেমী, মাদার কেযার একাডেমী) নামে দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক। এটি আইনগতভাবে বৈধ কী না, এ বিষয়ে জানতে চাইলে লিটন মিয়া জানান,আমি এ বিষয়ে আগে অবগত ছিলাম না। আমরা সাধারণ সভায় সব বিষয়ে আলোচনা করে ব্যবস্থা নিবো।
এ ব্যাপারে গাজীপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা)আফরোজা আক্তার রোবা জানান, এরকম যদি কোন ঘটনা মনিপুর মোস্তাফিয়া দাখিল মাদ্রাসায় ঘটে থাকে তাহলে আমরা তদন্ত করে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।ঘটনার সাথে জড়িতদের বিরুদ্বে শাস্তিমূলক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শিক্ষার্থীদের জীবন নিয়ে খেলা করলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

খবরটি শেয়ার করুন..

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© All rights reserved 2018 khoborbangladesh.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com