ঢাকা ০৪:৫৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ জুন ২০২৪, ১০ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :
আদমদীঘিতে শিশু ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগ: গ্রেফতার-১ মহম্মদপুরে হত্যার মামলার আসামি জামিনে এসে বাদিকে মামলা তুলে নেয়ার হুমকি, পরে মারধর আ.লীগ নেতার হুমকিতে নিরাপত্তাহীনতায় আইসক্রিম ফাক্টরি মালিক কালিহাতীতে লিঙ্গ কাটার অভিযোগ স্ত্রী’র বিরুদ্ধে ফিটনেস বিহীন নৌযানে সয়লাব সদরঘাট,নেই পর্যাপ্ত দক্ষ নাবিক! ৫০ কোটি টাকার মামলা থেকে বাঁচতে প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার পাল্টা মামলা! ফরিদপুরে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় তোলপাড় রশুনিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদের নব সভাপতি হলেন আবু সাঈদ মির্জাগঞ্জে আমর্ড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) উদ্যোগে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ মাগুরার হৃদয়পুরে ফসলি জমির টপসয়েল মাটিকাটার অভিযোগ, ইউএনওর হস্তক্ষেপে কাজ বন্ধ

শাহআলী থানার মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামি আলকেস’কে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব-৪

ইসমাইল হোসেন সৌরভ
র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন, র‌্যাব এলিট ফোর্স হিসেবে আত্মপ্রকাশের সূচনালগ্ন থেকেই বিভিন্ন ধরনের অপরাধ নির্মূলের লক্ষ্যে অত্যন্ত আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সাথে কাজ করে আসছে। সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ নির্মূল ও মাদকবিরোধী অভিযানের পাশাপাশি খুন, চাঁদাবাজি, চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাই চক্রের সাথে জড়িত বিভিন্ন সংঘবদ্ধ ও সক্রিয় সন্ত্রাসী বাহিনীর সদস্যদের গ্রেফতার করে সাধারণ জনগণের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিনির্মাণের লক্ষ্যে জোড়ালো তৎপরতা অব্যাহত আছে। এছাড়াও বিগত দিনগুলোতে র‌্যাব-৪ চাঞ্চল্যকর ও ক্লুলেস হত্যাকান্ডের আসামী গ্রেফতারের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক দীর্ঘ সময় যাবত পলাতক মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত ও যাবজ্জীবন কারাদন্ডপ্রাপ্ত ছদ্মবেশী বেশ কয়েকজন র্দুর্ধষ খুনী, ডাকাত এবং ধর্ষককে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় যার মধ্যে চাঞ্চল্যকর গর্ভবতী জুলেখা (১৯) হত্যা মামলার মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামী সিরাজুল (৩৯)’কে ১৯ বছর পর, চাঞ্চল্যকর ইদ্রিস হত্যা মামলার মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামী নজরুল ইসলাম (৪২)’কে ০৭ বছর পর, চাঞ্চল্যকর আজাহার হত্যা মামলার মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামী কাউছারকে ৩১ বছর পর, চাঞ্চল্যকর গর্ভবতী নিপা ও তার ৩ বছরের মেয়ে জোতি’কে শ্বাসরোধ করে হত্যা মামলায় মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামী জাকির হোসেন (৪৭)’কে ১২ বছর পর, চাঞ্চল্যকর আগুনে পুড়িয়ে আম্বিয়া হত্যা মামলার দীর্ঘ ২১ বছরের পলাতক মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামী আলম (৪০)’কে ঢাকার বংশাল এলাকা থেকে এবং ঢাকা জেলার ধামরাইয়ের চাঞ্চল্যকর সামিনা হত্যা মামলায় মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামী রহিম ও রোকেয়া’কে ১৭ বছর পর চাঁদপুর থেকে গ্রেফতার করা হয়। এছাড়াও র‌্যাব-৪ হত্যা, ডাকাতি, ধর্ষণ এবং মাদকের মত স্পর্শকাতর মামলায় যাবজ্জীবনসহ বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ডপ্রাপ্ত ২০/৩০ বছর অসংখ্য পলাতক আসামী’কে গ্রেফতার করতে সমর্থ হয়। এরই ধারাবাহিকতায় র‌্যাব-৪ এর একটি চৌকস আভিযানিক দল গত ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২২ তারিখ রাতে বরিশাল মহানগরী এলাকা হতে রাজধানীর শাহ আলী থানার চাঞ্চল্যকর প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে বাসু হত্যা মামলার প্রধান আসামী দীর্ঘ ১২ বছরের পলাতক মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামী মোঃ আলকেস (৫২)’কে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। গ্রেফতারকৃত আসামীকে জিজ্ঞাসাবাদ ও ঘটনার বিবরণে জানা যায় যে, গ্রেফতারকৃত আসামী মোঃ আলকেস, মামলার বাদী চিনু মিয়া ও ভিকটিম বাসু মিয়া (৪৮) একই এলাকার বাসিন্দা। মামলার বাদী চিনু মিয়া ভিকটিম বাসু মিয়ার আপন ছোট ভাই। গ্রেফতারকৃত আসামী রাজধানীর শাহ আলী থানাধীন চটবাড়ী নবাবেরবাগ এলাকার ২০০ সদস্য বিশিষ্ট একটি মৎস্যজীবী সমিতির সদস্য। ভিকটিম বাসু মিয়া ও বাদী চিনু মিয়ার চটবাড়ী এলাকায় ১০ শতাংশের একটি পৈত্রিক দখলীয় সম্পত্তি ছিল। জমিটি আজগর আলীর কাছে বাৎসরিক ভিত্তিতে লীজ দেওয়া ছিল। কিন্তু একসময় আসামী আজগর আলী প্রতারণামূলক জাল দলিল করে নিজের নামে নিয়ে নেয় এবং পরবর্তীতে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে ২০১০ সালে সমীতির নামে হস্তান্তর করে। এতে করে উক্ত জমি মালিকানা নিয়ে মামলার বাদী চিনু মিয়া এবং ভিকটিম বাসু মিয়ার সাথে মৎসজীবি সমিতীর বিরোধ সৃষ্টি হয়। তর্কিত জমিটি প্রকৃতপক্ষে মূল মালিক চিনু মিয়া ও বাসু মিয়া। সমিতির লোকজনের সংখ্যা বেশি হওয়ায় তারা অর্থাৎ এই মামলার আসামী আলকেসসহ অন্যান্য আসামী আজগর, গিয়াস উদ্দিন, সুানু মিয়া, জিন্নাত, রুমা, কদর আলীদের নেতৃত্বে উক্ত সমিতির নামে রাখা জমি জোরপূর্বক দখল করে জায়গাটিতে সীমানা প্রাচীর তৈরি করে ফেলে। তখন এই মামলার বাদী চিনু মিয়া ও ভিকটিম বাসু মিয়া আসামীদের সাথে বিরোধে না জড়িয়ে বিজ্ঞ সিভিল আদালতে মামলা দায়ের করার পর প্রায় দুই বছর পর বিজ্ঞ আদালত বাদী চিনু মিয়া ও বাসু মিয়ার পক্ষে রায় প্রদান করে। পরবর্তীতে মামলার বাদী এবং ভিকটিম বিজ্ঞ আদালতের রায় পেয়ে উক্ত জমিতে ২০১২ সালের শুরুতে বিল্ডিং নির্মাণ করা শুরু করে ১ম তলার ছাদ পর্যন্ত নির্মাণ কাজ সম্পূর্ন হয়। ঘটনার দিন ১৪ মে ২০১২ তারিখ বিকেল ০৫.০০ ঘটিকার সময় বাদীর চিনু মিয়ার ভাই ভিকটিম বাসু নবনির্মিত বিল্ডিংয়ের ছাদে পানি দেয়ার জন্য একজন কর্মচারী নিয়ে যায়। তখন উক্ত সমিতির সদস্যরা অর্থাৎ এই মামলার এজাহারনামীয় আসামী আলকেস, আজগর, রাজু, খলিল, সেলিম, কদর আলী, লেদুসহ অজ্ঞাতনামা আরো ৬/৭ জন আসামী আগ্নেয়াস্ত্র, দেশীয় ধারালো অস্ত্র ও লোহার রড নিয়ে আক্রমণ করে। আক্রমনের এক পর্যায়ে গ্রেফতারকৃত আসামী আলকেস তার কাছে থাকা অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র দ্বারা কয়েক রাউন্ড গুলি করলে ভিকটিম বাসুর মাথার বাম পাশে লেগে ডান পাশ দিয়ে বের হয়ে গেলে ভিকটিম বাসু ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করে। এই ঘটনায় ভিকটিমের ভাই চিনু মিয়া গ্রেফতারকৃত আসামী আলকেসসহ ১৩ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরো ৬/৭ জন আসামীর বিরুদ্ধে ঢাকা মহানগরীর শাহ আলী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন যার মামলা নং-২৪, তাং- ১৪/০৫/২০১২, ধারা- ১৪৩/৪৪৭/৪৪৮/৩০২/৩৪ দন্ডবিধি। ঘটনার পরবর্তী তিন মাসের মধ্যে আলকেসসহ অধিকাংশ আসামিদের পুলিশ গ্রেফতার করে কারাগারে প্রেরণ করে। পুলিশ হেফাজতে থাকাকালীন সময়ে আসামী আলকেস নিজেকে সম্পৃক্ত করে অন্যান্য আসামীর নাম উল্লেখপূর্বক বিজ্ঞ আদালতে ফৌঃ কাঃ বিঃ ১৬৪ ধারা মোতাবেক স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করে। কিন্তু আসামীরা চার মাস কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পেলে অন্যান্য আসামিরা আদালতে হাজিরা দিলেও আসামী আলকেস জামিন নিয়ে আত্মগোপনে চলে যায় এবং এই মামলায় আর কখনো হাজিরা দেয়নি। উক্ত মামলাটি তদন্ত করে তদন্ত কর্মকর্তা বিজ্ঞ আদালতে এজাহারনামীয় ১৩ জন এবং তদন্তে প্রাপ্ত ০১ জনসহ মোট ১৪ জনের নামে অভিযোগপত্র দাখিল করলে বিজ্ঞ আদালত পর্যাপ্ত স্বাক্ষ্য প্রমাণের উপর ভিত্তি করে বিচারকার্য পরিচালনা করে ১৫ নভেম্বর ২০২১ তারিখ আসামী মোঃ আলকেস, আজগর আলী, খলিল, সেলিম ও রাজুসহ মোট ০৫ জন আসামীকে মৃত্যুদন্ড, আসামী কদর আলী ও লেদু’কে যাবজ্জীবন কারাদন্ড প্রদান করেন। জামিনে থাকা অবস্থায় গ্রেফতারকৃত আসামী আলকেস গং এর সাথে আসামী আজাহার ও সানুর মতবিরোধ সৃষ্টি হওয়ায় আলকেস গং কর্তৃক আজাহার ও সানু নির্মমভাবে হত্যাকান্ডের শিকার হয়। এই ডবল মার্ডারের মূল আসামী মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত গ্রেফতারকৃত আসামী আলকেস। উক্ত ঘটনায আসামী মোঃ আলকেস এর বিরুদ্ধে আরো একটি হত্যা মামলা বিজ্ঞ আদালতে বিচারাধীন এবং তার বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট পেন্ডিং আছে। যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামী কদর আলী হাজতে থাকা অবস্থায় স্টোক করে মারা যায় এবং অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় বিজ্ঞ আদালত আসামী নসু, জিন্নাত, গিয়াস, সালেম উদ্দিন এবং রুমাসহ মোট ০৫ জনকে খালাস প্রদান করে।
আত্মগোপনে থাকাকালীন সময় আসামী আলকেসের জীবনযাপনঃ
আসামী আলকেসের বিরুদ্ধে বাসু হত্যা মামলা রুজু হওয়ায় চার মাস হাজত খেটে জামিন নিয়ে এলাকায় অবৈধ বালুর ব্যবসা শুরু করে। বাসু হত্যা মামলার আসামী আজাহার এবং সানুর সাথে বিরোধ সৃষ্টি হওয়ায় আসামী আলকেস এর নেতৃত্বে সাভার থানা এলাকায় আজাহার ও সানুকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় এবং ৩০২/২০১ ধারায় একটি হত্যা মামলা রুজু হয়। এই মামলায় সে সাভার থানার ওয়ারেন্টভূক্ত পলাতক আসামী। অবৈধভাবে বালূ উত্তোলন এবং সংরক্ষন করায় অপরাধে পরিবেশ অধিদপ্তর তার বিরুদ্ধে শাহ আলী থানায় ৪৩১/৩৪ ধারায় মামলা রুজু করে এবং এই মামলায় সে পলাতক ওয়ারেন্টভূক্ত আসামী। এছাড়াও সে শাহ আলী থানায় ৩৯৯/৪০২ ধারায় ডাকাতির প্রস্তুতি মামলার ওয়ারেন্টভূক্ত পলাতক আসামী। এসকল মামলায় গ্রেফতার এড়ানোর জন্য সে লোক চক্ষুর আড়ালে সে নিজেকে আত্মগোপনে চলে যায়। গত ১২ বছর ধরে আসামী আলকেস ঠিকানা পরিবর্তন করে বিভিন্ন ছদ্মবেশ ধারণ করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় আত্মগোপনে ছিল। আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় আসামী নিজের পরিচয় গোপন করার জন্য ক্রমাগতভাবে সে পেশা পরিবর্তন করে আসছিলো। প্রথমদিকে সে সাভারের বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকের কাজের পাশাপাশি হত্যা, ডাকাতি করতো। পরবর্তীতে সে বরিশাল গিয়ে ট্রাকের হেল্পার ও পরে ড্রাইভার হিসেবে কাজ করে। বেপরোয়াভাবে বাস চালানের সময় সিলেটে তার বাসের নিচে পরে একজন নির্মভাবে নিহত হয় এবং এই ঘটনায় সিলেটের ওসমানীনগর থানায় পরিবহন আইনে ৮৭/১০৫ ধারায় তার বিরুদ্ধে পুনরায় হত্যা মামলা হলে সে পালিয়ে কুয়াকাটা মাছ ধরার ট্রলারে কাজ শুরু করে। উল্লেখ্য যে জিজ্ঞাসাবাদে সে মাছ ধরার পাশাপাশি সাগরে বিভিন্ন ট্রলারে ডাকাতি করত বলে স্বীকার করেছে। প্রকৃতপক্ষে সে একজন অভ্যাসগত কুখ্যাত অপরাধী। গ্রেফতারের পূর্ব পর্যন্ত আসামী আলকেস গত দেড় বছর যাবত একটি দূর পাল্লার পরিবহনের ড্রাইভার হিসেবে কাজ করে আসছিলো।
আসামীর জীবন বৃত্তান্ত 
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায় যে, আসামী ১৯৭১ সালে ঢাকা জেলার মিরপুর থানাধীন নবাবেরবাগ এলাকায় জন্মগ্রহণ করে। চার ভাই ও এক বোনের মধ্যে সে ২য় সন্তান। আসামী একজন নিরক্ষর এবং গোয়াঁর ও নৃশংশ প্রকৃতির মানুষ। ব্যক্তিগত জীবনে আসামী বিবাহিত এবং তার দুইটি সন্তান আছে যারা তাদের মায়ের সঙ্গে নবাবেরবাগে থাকে। ঘটনার পর হতে আসামি ঢাকার সাভার এলাকায় নিজের নাম ঠিকানা গোপন করে একটা বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতো। তবে বেশির ভাগ সময় আসামি সে বাসায়ও অবস্থান করতো না বরং ফরিদপুর, বরিশাল, পটুয়াখালী, ঝালকাঠি ও পিরোজপুরের বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ডে অবস্থান করতো। ঘটনার পর হতে আসামি কখনো তার নিজ বাড়ি নবাবেরবাগ যাননি। গ্রেফতারকৃত আসামীকে সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন আছে।

ট্যাগস
জনপ্রিয় সংবাদ

আদমদীঘিতে শিশু ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগ: গ্রেফতার-১

শাহআলী থানার মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামি আলকেস’কে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব-৪

আপডেট টাইম : ০৫:৩৭:৩০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২

ইসমাইল হোসেন সৌরভ
র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন, র‌্যাব এলিট ফোর্স হিসেবে আত্মপ্রকাশের সূচনালগ্ন থেকেই বিভিন্ন ধরনের অপরাধ নির্মূলের লক্ষ্যে অত্যন্ত আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সাথে কাজ করে আসছে। সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ নির্মূল ও মাদকবিরোধী অভিযানের পাশাপাশি খুন, চাঁদাবাজি, চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাই চক্রের সাথে জড়িত বিভিন্ন সংঘবদ্ধ ও সক্রিয় সন্ত্রাসী বাহিনীর সদস্যদের গ্রেফতার করে সাধারণ জনগণের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিনির্মাণের লক্ষ্যে জোড়ালো তৎপরতা অব্যাহত আছে। এছাড়াও বিগত দিনগুলোতে র‌্যাব-৪ চাঞ্চল্যকর ও ক্লুলেস হত্যাকান্ডের আসামী গ্রেফতারের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক দীর্ঘ সময় যাবত পলাতক মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত ও যাবজ্জীবন কারাদন্ডপ্রাপ্ত ছদ্মবেশী বেশ কয়েকজন র্দুর্ধষ খুনী, ডাকাত এবং ধর্ষককে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় যার মধ্যে চাঞ্চল্যকর গর্ভবতী জুলেখা (১৯) হত্যা মামলার মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামী সিরাজুল (৩৯)’কে ১৯ বছর পর, চাঞ্চল্যকর ইদ্রিস হত্যা মামলার মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামী নজরুল ইসলাম (৪২)’কে ০৭ বছর পর, চাঞ্চল্যকর আজাহার হত্যা মামলার মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামী কাউছারকে ৩১ বছর পর, চাঞ্চল্যকর গর্ভবতী নিপা ও তার ৩ বছরের মেয়ে জোতি’কে শ্বাসরোধ করে হত্যা মামলায় মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামী জাকির হোসেন (৪৭)’কে ১২ বছর পর, চাঞ্চল্যকর আগুনে পুড়িয়ে আম্বিয়া হত্যা মামলার দীর্ঘ ২১ বছরের পলাতক মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামী আলম (৪০)’কে ঢাকার বংশাল এলাকা থেকে এবং ঢাকা জেলার ধামরাইয়ের চাঞ্চল্যকর সামিনা হত্যা মামলায় মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামী রহিম ও রোকেয়া’কে ১৭ বছর পর চাঁদপুর থেকে গ্রেফতার করা হয়। এছাড়াও র‌্যাব-৪ হত্যা, ডাকাতি, ধর্ষণ এবং মাদকের মত স্পর্শকাতর মামলায় যাবজ্জীবনসহ বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ডপ্রাপ্ত ২০/৩০ বছর অসংখ্য পলাতক আসামী’কে গ্রেফতার করতে সমর্থ হয়। এরই ধারাবাহিকতায় র‌্যাব-৪ এর একটি চৌকস আভিযানিক দল গত ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২২ তারিখ রাতে বরিশাল মহানগরী এলাকা হতে রাজধানীর শাহ আলী থানার চাঞ্চল্যকর প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি করে বাসু হত্যা মামলার প্রধান আসামী দীর্ঘ ১২ বছরের পলাতক মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামী মোঃ আলকেস (৫২)’কে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। গ্রেফতারকৃত আসামীকে জিজ্ঞাসাবাদ ও ঘটনার বিবরণে জানা যায় যে, গ্রেফতারকৃত আসামী মোঃ আলকেস, মামলার বাদী চিনু মিয়া ও ভিকটিম বাসু মিয়া (৪৮) একই এলাকার বাসিন্দা। মামলার বাদী চিনু মিয়া ভিকটিম বাসু মিয়ার আপন ছোট ভাই। গ্রেফতারকৃত আসামী রাজধানীর শাহ আলী থানাধীন চটবাড়ী নবাবেরবাগ এলাকার ২০০ সদস্য বিশিষ্ট একটি মৎস্যজীবী সমিতির সদস্য। ভিকটিম বাসু মিয়া ও বাদী চিনু মিয়ার চটবাড়ী এলাকায় ১০ শতাংশের একটি পৈত্রিক দখলীয় সম্পত্তি ছিল। জমিটি আজগর আলীর কাছে বাৎসরিক ভিত্তিতে লীজ দেওয়া ছিল। কিন্তু একসময় আসামী আজগর আলী প্রতারণামূলক জাল দলিল করে নিজের নামে নিয়ে নেয় এবং পরবর্তীতে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে ২০১০ সালে সমীতির নামে হস্তান্তর করে। এতে করে উক্ত জমি মালিকানা নিয়ে মামলার বাদী চিনু মিয়া এবং ভিকটিম বাসু মিয়ার সাথে মৎসজীবি সমিতীর বিরোধ সৃষ্টি হয়। তর্কিত জমিটি প্রকৃতপক্ষে মূল মালিক চিনু মিয়া ও বাসু মিয়া। সমিতির লোকজনের সংখ্যা বেশি হওয়ায় তারা অর্থাৎ এই মামলার আসামী আলকেসসহ অন্যান্য আসামী আজগর, গিয়াস উদ্দিন, সুানু মিয়া, জিন্নাত, রুমা, কদর আলীদের নেতৃত্বে উক্ত সমিতির নামে রাখা জমি জোরপূর্বক দখল করে জায়গাটিতে সীমানা প্রাচীর তৈরি করে ফেলে। তখন এই মামলার বাদী চিনু মিয়া ও ভিকটিম বাসু মিয়া আসামীদের সাথে বিরোধে না জড়িয়ে বিজ্ঞ সিভিল আদালতে মামলা দায়ের করার পর প্রায় দুই বছর পর বিজ্ঞ আদালত বাদী চিনু মিয়া ও বাসু মিয়ার পক্ষে রায় প্রদান করে। পরবর্তীতে মামলার বাদী এবং ভিকটিম বিজ্ঞ আদালতের রায় পেয়ে উক্ত জমিতে ২০১২ সালের শুরুতে বিল্ডিং নির্মাণ করা শুরু করে ১ম তলার ছাদ পর্যন্ত নির্মাণ কাজ সম্পূর্ন হয়। ঘটনার দিন ১৪ মে ২০১২ তারিখ বিকেল ০৫.০০ ঘটিকার সময় বাদীর চিনু মিয়ার ভাই ভিকটিম বাসু নবনির্মিত বিল্ডিংয়ের ছাদে পানি দেয়ার জন্য একজন কর্মচারী নিয়ে যায়। তখন উক্ত সমিতির সদস্যরা অর্থাৎ এই মামলার এজাহারনামীয় আসামী আলকেস, আজগর, রাজু, খলিল, সেলিম, কদর আলী, লেদুসহ অজ্ঞাতনামা আরো ৬/৭ জন আসামী আগ্নেয়াস্ত্র, দেশীয় ধারালো অস্ত্র ও লোহার রড নিয়ে আক্রমণ করে। আক্রমনের এক পর্যায়ে গ্রেফতারকৃত আসামী আলকেস তার কাছে থাকা অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র দ্বারা কয়েক রাউন্ড গুলি করলে ভিকটিম বাসুর মাথার বাম পাশে লেগে ডান পাশ দিয়ে বের হয়ে গেলে ভিকটিম বাসু ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করে। এই ঘটনায় ভিকটিমের ভাই চিনু মিয়া গ্রেফতারকৃত আসামী আলকেসসহ ১৩ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরো ৬/৭ জন আসামীর বিরুদ্ধে ঢাকা মহানগরীর শাহ আলী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন যার মামলা নং-২৪, তাং- ১৪/০৫/২০১২, ধারা- ১৪৩/৪৪৭/৪৪৮/৩০২/৩৪ দন্ডবিধি। ঘটনার পরবর্তী তিন মাসের মধ্যে আলকেসসহ অধিকাংশ আসামিদের পুলিশ গ্রেফতার করে কারাগারে প্রেরণ করে। পুলিশ হেফাজতে থাকাকালীন সময়ে আসামী আলকেস নিজেকে সম্পৃক্ত করে অন্যান্য আসামীর নাম উল্লেখপূর্বক বিজ্ঞ আদালতে ফৌঃ কাঃ বিঃ ১৬৪ ধারা মোতাবেক স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করে। কিন্তু আসামীরা চার মাস কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পেলে অন্যান্য আসামিরা আদালতে হাজিরা দিলেও আসামী আলকেস জামিন নিয়ে আত্মগোপনে চলে যায় এবং এই মামলায় আর কখনো হাজিরা দেয়নি। উক্ত মামলাটি তদন্ত করে তদন্ত কর্মকর্তা বিজ্ঞ আদালতে এজাহারনামীয় ১৩ জন এবং তদন্তে প্রাপ্ত ০১ জনসহ মোট ১৪ জনের নামে অভিযোগপত্র দাখিল করলে বিজ্ঞ আদালত পর্যাপ্ত স্বাক্ষ্য প্রমাণের উপর ভিত্তি করে বিচারকার্য পরিচালনা করে ১৫ নভেম্বর ২০২১ তারিখ আসামী মোঃ আলকেস, আজগর আলী, খলিল, সেলিম ও রাজুসহ মোট ০৫ জন আসামীকে মৃত্যুদন্ড, আসামী কদর আলী ও লেদু’কে যাবজ্জীবন কারাদন্ড প্রদান করেন। জামিনে থাকা অবস্থায় গ্রেফতারকৃত আসামী আলকেস গং এর সাথে আসামী আজাহার ও সানুর মতবিরোধ সৃষ্টি হওয়ায় আলকেস গং কর্তৃক আজাহার ও সানু নির্মমভাবে হত্যাকান্ডের শিকার হয়। এই ডবল মার্ডারের মূল আসামী মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত গ্রেফতারকৃত আসামী আলকেস। উক্ত ঘটনায আসামী মোঃ আলকেস এর বিরুদ্ধে আরো একটি হত্যা মামলা বিজ্ঞ আদালতে বিচারাধীন এবং তার বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট পেন্ডিং আছে। যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামী কদর আলী হাজতে থাকা অবস্থায় স্টোক করে মারা যায় এবং অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় বিজ্ঞ আদালত আসামী নসু, জিন্নাত, গিয়াস, সালেম উদ্দিন এবং রুমাসহ মোট ০৫ জনকে খালাস প্রদান করে।
আত্মগোপনে থাকাকালীন সময় আসামী আলকেসের জীবনযাপনঃ
আসামী আলকেসের বিরুদ্ধে বাসু হত্যা মামলা রুজু হওয়ায় চার মাস হাজত খেটে জামিন নিয়ে এলাকায় অবৈধ বালুর ব্যবসা শুরু করে। বাসু হত্যা মামলার আসামী আজাহার এবং সানুর সাথে বিরোধ সৃষ্টি হওয়ায় আসামী আলকেস এর নেতৃত্বে সাভার থানা এলাকায় আজাহার ও সানুকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় এবং ৩০২/২০১ ধারায় একটি হত্যা মামলা রুজু হয়। এই মামলায় সে সাভার থানার ওয়ারেন্টভূক্ত পলাতক আসামী। অবৈধভাবে বালূ উত্তোলন এবং সংরক্ষন করায় অপরাধে পরিবেশ অধিদপ্তর তার বিরুদ্ধে শাহ আলী থানায় ৪৩১/৩৪ ধারায় মামলা রুজু করে এবং এই মামলায় সে পলাতক ওয়ারেন্টভূক্ত আসামী। এছাড়াও সে শাহ আলী থানায় ৩৯৯/৪০২ ধারায় ডাকাতির প্রস্তুতি মামলার ওয়ারেন্টভূক্ত পলাতক আসামী। এসকল মামলায় গ্রেফতার এড়ানোর জন্য সে লোক চক্ষুর আড়ালে সে নিজেকে আত্মগোপনে চলে যায়। গত ১২ বছর ধরে আসামী আলকেস ঠিকানা পরিবর্তন করে বিভিন্ন ছদ্মবেশ ধারণ করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় আত্মগোপনে ছিল। আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় আসামী নিজের পরিচয় গোপন করার জন্য ক্রমাগতভাবে সে পেশা পরিবর্তন করে আসছিলো। প্রথমদিকে সে সাভারের বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকের কাজের পাশাপাশি হত্যা, ডাকাতি করতো। পরবর্তীতে সে বরিশাল গিয়ে ট্রাকের হেল্পার ও পরে ড্রাইভার হিসেবে কাজ করে। বেপরোয়াভাবে বাস চালানের সময় সিলেটে তার বাসের নিচে পরে একজন নির্মভাবে নিহত হয় এবং এই ঘটনায় সিলেটের ওসমানীনগর থানায় পরিবহন আইনে ৮৭/১০৫ ধারায় তার বিরুদ্ধে পুনরায় হত্যা মামলা হলে সে পালিয়ে কুয়াকাটা মাছ ধরার ট্রলারে কাজ শুরু করে। উল্লেখ্য যে জিজ্ঞাসাবাদে সে মাছ ধরার পাশাপাশি সাগরে বিভিন্ন ট্রলারে ডাকাতি করত বলে স্বীকার করেছে। প্রকৃতপক্ষে সে একজন অভ্যাসগত কুখ্যাত অপরাধী। গ্রেফতারের পূর্ব পর্যন্ত আসামী আলকেস গত দেড় বছর যাবত একটি দূর পাল্লার পরিবহনের ড্রাইভার হিসেবে কাজ করে আসছিলো।
আসামীর জীবন বৃত্তান্ত 
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায় যে, আসামী ১৯৭১ সালে ঢাকা জেলার মিরপুর থানাধীন নবাবেরবাগ এলাকায় জন্মগ্রহণ করে। চার ভাই ও এক বোনের মধ্যে সে ২য় সন্তান। আসামী একজন নিরক্ষর এবং গোয়াঁর ও নৃশংশ প্রকৃতির মানুষ। ব্যক্তিগত জীবনে আসামী বিবাহিত এবং তার দুইটি সন্তান আছে যারা তাদের মায়ের সঙ্গে নবাবেরবাগে থাকে। ঘটনার পর হতে আসামি ঢাকার সাভার এলাকায় নিজের নাম ঠিকানা গোপন করে একটা বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতো। তবে বেশির ভাগ সময় আসামি সে বাসায়ও অবস্থান করতো না বরং ফরিদপুর, বরিশাল, পটুয়াখালী, ঝালকাঠি ও পিরোজপুরের বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ডে অবস্থান করতো। ঘটনার পর হতে আসামি কখনো তার নিজ বাড়ি নবাবেরবাগ যাননি। গ্রেফতারকৃত আসামীকে সংশ্লিষ্ট থানায় হস্তান্তর কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন আছে।