ঢাকা ১১:৩৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৪, ১ বৈশাখ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

ভোটের আগে প্রশাসন-পুলিশের পদোন্নতির ছড়াছড়ি

প্রশাসনে অতিরিক্ত সচিব ও পুলিশসহ অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি, পুলিশ সুপার ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারাও পেয়েছেন পদোন্নতি। গত কয়েক মাসে এই তিন ক্যাডারের বিভিন্ন পদে ১৬০৮ কর্মকর্তার পদোন্নতি হয়। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে আরেক দফা পুলিশের অতিরিক্ত আইজি, ডিআইজি, অতিরিক্ত ডিআইজি পদে পদোন্নতি দেওয়া হবে। একই সঙ্গে প্রশাসনেও অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি হচ্ছে। গত দুদিন ধরে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বাধীন সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের (এসএসবি) কয়েক দফা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সভায় এসব পদে পদোন্নতির বিষয়ে চূড়ান্ত করা হয়েছে। আজ মঙ্গলবার বা কালকের মধ্যে পদোন্নতি সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হতে পারে।

জানা গেছে, মে থেকে নভেম্বর পর্যন্ত তিন ক্যাডারের বিভিন্ন পদে পদোন্নতি হয়েছে। এর মধ্যে প্রশাসন ক্যাডারের অতিরিক্ত সচিব পদে ১১৪, যুগ্ম সচিব পদে ২২১, উপসচিব পদে ১৭৮ কর্মকর্তা। এতে উপসচিব পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে ২৯তম ব্যাচের প্রথমসহ বেশ কিছু মেধাবী কর্মকর্তা বঞ্চিত হয়েছেন। তবে যারা উপসচিব হয়েছেন তাদের মধ্যে ১৩ জন আছেন মন্ত্রী ও সচিবের একান্ত সচিব ও সহকারী একান্ত সচিব। পুলিশ ক্যাডারের অতিরিক্ত ডিআইজি পদে পদোন্নতি পেয়েছেন ১৫২ হন, পুলিশ সুপার পদে ১৭৭ এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদে ৪৬ কর্মকর্তা এবং শিক্ষা ক্যাডারের ৬৯০ কর্মকর্তা সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পেয়েছেন। নভেম্বরেই পুলিশ ক্যাডারের তিন পদে এবং প্রশাসনের উপসচিব পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়।

সূত্র জানায়, প্রশাসনে শূন্য পদ ছাড়াও পদোন্নতি দেওয়া হয় বলে পুলিশ ক্যাডার থেকে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ করা হয়। তাদের পদ না থাকায় পদোন্নতি বঞ্চিত হয়ে আসছেন বলে সরকারের উচ্চপর্যায়ে লিখিতভাবে জানিয়ে আসছিলেন তারা। পদোন্নতি না পাওয়ায় তারা অনেকটা হতাশার মধ্যে ছিলেন। তাই ভারসাম্য আনতে তারাও প্রশাসনের মতো পদোন্নতি চেয়ে আসছিলেন। এরই প্রেক্ষিতে পুলিশের বিভিন্ন পদে পদোন্নতির জন্য সুপারনিউমারারি পদ তৈরি করা হয়েছে।

গত কয়েক মাসে অতিরিক্ত সচিব থেকে উপসচিব পর্যন্ত পদোন্নতি অনুমোদিত পদের চেয়ে বেশিই হয়েছে। এটা এবারই প্রথম তা নয়, আগেও হয়েছে। তবে প্রশাসন ক্যাডারের কিছু বিষয় পুলিশ ক্যাডারেও প্রভাব পড়েছে, যেমন সুপারনিউমারারি পদ সৃজন। এক্ষেত্রেও সরকার অনুমোদন দিয়েছে। কাজেই পদোন্নতি ঘিরে হাসি-কান্না বা আনন্দ-বেদনা, সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্টি সবই পুরোনো। কিছুটা হলেও নতুন বিষয় হচ্ছে সরকারের চলতি মেয়াদের শেষদিকে দফায় দফায় পদোন্নতি। এই সময়টা ঘিরেই চলছে আলোচনা। যে যার মতো এসবের ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। প্রশাসনের সাবেক ও বর্তমান শীর্ষ কর্মকর্তাদের অনেকেই প্রায় একই কথা বলছেন। তাদের কেউ বলছেন শূন্য পদ ছাড়া পদোন্নতি দেওয়া ঠিক হয়নি। কেউ বলছেন ভোটের আগে এ ধরনের সিদ্ধান্ত সরকারের উদ্যোগকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রশাসনে বর্তমানে অতিরিক্ত সচিবের পদ ২১২টি। প্রেষণ পদ ১২৫টি। সর্বমোট অনুমোদিত পদ ৩৩৭টি। ১২ মে বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ১৭তম ব্যাচকে বিবেচনায় নিয়ে ১৪৪ জনকে অতিরিক্ত সচিব হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়। বর্তমানে ৩৩৭ পদের বিপরীতে কর্মরত অতিরিক্ত সচিবের সংখ্যা ৪২৬। যুগ্ম সচিবের অনুমোদিত পদ ৫০২টি। ৪ সেপ্টেম্বর বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ২২তম ব্যাচকে বিবেচনায় নিয়ে ২২১ জনকে যুগ্ম সচিব হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ৯৪৬ কর্মকর্তা যুগ্ম সচিব হিসেবে কর্মরত। অনুমোদিত পদের চেয়ে ৪৪৪ কর্মকর্তা বেশি পদোন্নতি পেয়েছেন। তাদের অধিকাংশই আগের পদেই যুগ্ম সচিব হিসেবে কাজ করছেন। উপসচিবের অনুমোদিত পদ ১৪২৮টি। তার মধ্যে সুপারনিউমারারি পদ ৪৩০টি। সর্বশেষ ১১ নভেম্বর বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ২৯তম ব্যাচকে বিবেচনায় নিয়ে ১৭৮ জনকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে প্রশাসনে ১৭০২ কর্মকর্তা উপসচিব হিসেবে কর্মরত।

এ ছাড়া বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ১৮ ব্যাচকে বিবেচনায় নিয়ে অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতির প্রক্রিয়া চলছে। ১১ নভেম্বর প্রশাসন ছাড়া অন্যান্য ক্যাডারের (আদার্স ক্যাডারের) আরও ৬২ কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়। তিন ধাপেই অনুমোদিত পদের বেশি পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে সাবেক সচিব আবু আলম মো. শহীদ খান বলেন, পদোন্নতি পাওয়ার যোগ্য হলে তাদের তা দিতে হবে। তারা দেশের জন্য কাজ করেন, সুতরাং তাদের সময়মতো পদোন্নতি দিতে হবে। প্রশ্ন হচ্ছে, সময় নিয়ে। এই সময়ের পদোন্নতি জনমনে প্রশ্ন উঠতেই পারে। এই সময় এত কর্মকর্তার পদোন্নতি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দেওয়ার অভিযোগ কেউ কেউ করতেই পারেন। তবে তার ব্যক্তিগত মত হচ্ছে, পদোন্নতি সমস্যা নয়। সমস্যা সময়টা। তফসেলের আগে এত পদোন্নতি কেন?

সূত্র মতে, গত ৬ নভেম্বর পুলিশ ক্যাডারে অতিরিক্ত উপপুলিশ মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) পদে ১২ কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। একই তারিখে সুপারনিউমারারি অতিরিক্ত উপপুলিশ মহাপরিদর্শক পদে ১৪০ কর্মকর্তার পদোন্নতি হয়। আগে থেকে কর্মরত আছেন ১৪০ অতিরিক্ত উপপুলিশ মহাপরিদর্শক। সব মিলিয়ে বর্তমানে অতিরিক্ত উপপুলিশ মহাপরিদর্শক পদে ২৯২ কর্মকর্তা কর্মরত। অনুমোদিত অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক পদ হচ্ছে ২০০টি। পুলিশ সুপার (এসপি) অনুমোদিত পদ ৫৯৩টি। ৬ নভেম্বর সর্বশেষ ১৭৭ কর্মকর্তা পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতি পেয়েছেন। তার মধ্যে ২৭ জন কর্মকর্তার পদোন্নতি নিয়মিত। সুপারনিউমারারি পুলিশ সুপার পদে ১৫০ কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়। বর্তমানে দেশে ৬১৮ জন পুলিশ সুপার পদমর্যাদার কর্মকর্তা কর্মরত। এ ছাড়া সুপারনিউমারারি পদে কর্মরত ১৫০ জন। সর্বমোট পুলিশ সুপার পদমর্যাদার ৭৬৮ কর্মকর্তা কর্মরত। অপরদিকে ১২ নভেম্বর সহকারী পুলিশ সুপার থেকে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদে ৪৬ কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের অনুমোদিত পদ ১০০১টি। আজ বা কালের মধ্যে উপমহাপুলিশ পরিদর্শক (ডিআইজি) এবং অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক (অ্যাডিশনাল আইজি) পদে পদোন্নতি দেওয়া হবে। এর আগে ২৭ সেপ্টেম্বর বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের ৬৯০ জনকে সহকারী অধ্যাপক থেকে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদেরও অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য এসএসবির বিবেচনায় আনা হয়েছে।

এ বিষয়ে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার বলেছেন, ‘পদ শূন্য থাকলে এবং পদোন্নতি পাওয়ার যোগ্য কর্মকর্তা থাকলে তা দিতে কোনো সমস্যা নেই। এমনকি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরও যদি পদ থাকে এবং পদোন্নতি যোগ্য কর্মকর্তা থাকে তাকে পদোন্নতি দিতে হবে। কিন্তু পদ নেই তারপরও পদোন্নতি দেওয়া উচিত নয়। সুপারনিউমারারি পদে কখনও পদোন্নতি দেওয়া উচিত নয়।’

সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক একেএম শহীদুল হক বলেন, একই পদে দীর্ঘদিন চাকরির ফলে কর্মকর্তাদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা চলে আসে। প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা সুপারনিউমারারি পদে পদোন্নতি নিচ্ছেন। তাদের অনুকরণে পুলিশ ক্যাডারে পদোন্নতির জন্য সুপানিউমারারি পদ সৃজনের অনুমোদন চাওয়া হয়েছে। সরকার তা অনুমোদন দিয়েছে। সে কারণে সুপারনিউমারারি পদে পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, সময়টা নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জাতীয় নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকেন প্রশাসন, পুলিশ এবং শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা। গত কয়েক মাসে এই তিন ক্যাডারের বিভিন্ন পদে মোট ১৬০৮ কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এতে নতুন পদ পাওয়া সবাই খুশি হয়েছেন। ক্যাডার কর্মকর্তাদের হরহামেশা পদোন্নতি হওয়ায় মাঠপর্যায়ের ননক্যাডার কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে। পুলিশ প্রশাসনের ননক্যাডার কর্মকর্তাদের অনেকেই দীর্ঘদিন পদোন্নতিবঞ্চিত হওয়ায় তারা প্রকাশ্যে সরকারের কাছে পদোন্নতির দাবি তুলেছেন। এরই মধ্যে তারা পদোন্নতির দাবিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছেন। এখন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তারা সাক্ষাৎ করতে চাইছেন। একই ধরনের অসন্তোষ আছে অন্যান্য ধাপের ননক্যাডার কর্মকর্তাদের মধ্যেও।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অন্যান্য ক্যাডারের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, সুপারনিউমারারি পদোন্নতি দিতেই যদি হয় তাহলে শুধু প্রশাসন এবং পুলিশ ক্যাডারে কেন? অন্য সব ক্যাডারেও দেওয়া উচিত। জাতীয় নির্বাচনে তারা বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে বিধায় এ ধরনের পদোন্নতি। অন্য ক্যাডারের ক্ষেত্রে বৈষম্য দেখালে কর্মক্ষেত্রে তারাও আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন। বৈষম্য দূর করার ক্ষেত্রে সরকারপ্রধানকে বিশেষ বিবেচনায় আনা উচিত বলে তারা মন্তব্য করেন।

ট্যাগস

ভোটের আগে প্রশাসন-পুলিশের পদোন্নতির ছড়াছড়ি

আপডেট টাইম : ০৭:৪৩:৫৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ নভেম্বর ২০২৩

প্রশাসনে অতিরিক্ত সচিব ও পুলিশসহ অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি, পুলিশ সুপার ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারাও পেয়েছেন পদোন্নতি। গত কয়েক মাসে এই তিন ক্যাডারের বিভিন্ন পদে ১৬০৮ কর্মকর্তার পদোন্নতি হয়। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে আরেক দফা পুলিশের অতিরিক্ত আইজি, ডিআইজি, অতিরিক্ত ডিআইজি পদে পদোন্নতি দেওয়া হবে। একই সঙ্গে প্রশাসনেও অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি হচ্ছে। গত দুদিন ধরে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বাধীন সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের (এসএসবি) কয়েক দফা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সভায় এসব পদে পদোন্নতির বিষয়ে চূড়ান্ত করা হয়েছে। আজ মঙ্গলবার বা কালকের মধ্যে পদোন্নতি সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হতে পারে।

জানা গেছে, মে থেকে নভেম্বর পর্যন্ত তিন ক্যাডারের বিভিন্ন পদে পদোন্নতি হয়েছে। এর মধ্যে প্রশাসন ক্যাডারের অতিরিক্ত সচিব পদে ১১৪, যুগ্ম সচিব পদে ২২১, উপসচিব পদে ১৭৮ কর্মকর্তা। এতে উপসচিব পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে ২৯তম ব্যাচের প্রথমসহ বেশ কিছু মেধাবী কর্মকর্তা বঞ্চিত হয়েছেন। তবে যারা উপসচিব হয়েছেন তাদের মধ্যে ১৩ জন আছেন মন্ত্রী ও সচিবের একান্ত সচিব ও সহকারী একান্ত সচিব। পুলিশ ক্যাডারের অতিরিক্ত ডিআইজি পদে পদোন্নতি পেয়েছেন ১৫২ হন, পুলিশ সুপার পদে ১৭৭ এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদে ৪৬ কর্মকর্তা এবং শিক্ষা ক্যাডারের ৬৯০ কর্মকর্তা সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পেয়েছেন। নভেম্বরেই পুলিশ ক্যাডারের তিন পদে এবং প্রশাসনের উপসচিব পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়।

সূত্র জানায়, প্রশাসনে শূন্য পদ ছাড়াও পদোন্নতি দেওয়া হয় বলে পুলিশ ক্যাডার থেকে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ করা হয়। তাদের পদ না থাকায় পদোন্নতি বঞ্চিত হয়ে আসছেন বলে সরকারের উচ্চপর্যায়ে লিখিতভাবে জানিয়ে আসছিলেন তারা। পদোন্নতি না পাওয়ায় তারা অনেকটা হতাশার মধ্যে ছিলেন। তাই ভারসাম্য আনতে তারাও প্রশাসনের মতো পদোন্নতি চেয়ে আসছিলেন। এরই প্রেক্ষিতে পুলিশের বিভিন্ন পদে পদোন্নতির জন্য সুপারনিউমারারি পদ তৈরি করা হয়েছে।

গত কয়েক মাসে অতিরিক্ত সচিব থেকে উপসচিব পর্যন্ত পদোন্নতি অনুমোদিত পদের চেয়ে বেশিই হয়েছে। এটা এবারই প্রথম তা নয়, আগেও হয়েছে। তবে প্রশাসন ক্যাডারের কিছু বিষয় পুলিশ ক্যাডারেও প্রভাব পড়েছে, যেমন সুপারনিউমারারি পদ সৃজন। এক্ষেত্রেও সরকার অনুমোদন দিয়েছে। কাজেই পদোন্নতি ঘিরে হাসি-কান্না বা আনন্দ-বেদনা, সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্টি সবই পুরোনো। কিছুটা হলেও নতুন বিষয় হচ্ছে সরকারের চলতি মেয়াদের শেষদিকে দফায় দফায় পদোন্নতি। এই সময়টা ঘিরেই চলছে আলোচনা। যে যার মতো এসবের ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। প্রশাসনের সাবেক ও বর্তমান শীর্ষ কর্মকর্তাদের অনেকেই প্রায় একই কথা বলছেন। তাদের কেউ বলছেন শূন্য পদ ছাড়া পদোন্নতি দেওয়া ঠিক হয়নি। কেউ বলছেন ভোটের আগে এ ধরনের সিদ্ধান্ত সরকারের উদ্যোগকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রশাসনে বর্তমানে অতিরিক্ত সচিবের পদ ২১২টি। প্রেষণ পদ ১২৫টি। সর্বমোট অনুমোদিত পদ ৩৩৭টি। ১২ মে বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ১৭তম ব্যাচকে বিবেচনায় নিয়ে ১৪৪ জনকে অতিরিক্ত সচিব হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়। বর্তমানে ৩৩৭ পদের বিপরীতে কর্মরত অতিরিক্ত সচিবের সংখ্যা ৪২৬। যুগ্ম সচিবের অনুমোদিত পদ ৫০২টি। ৪ সেপ্টেম্বর বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ২২তম ব্যাচকে বিবেচনায় নিয়ে ২২১ জনকে যুগ্ম সচিব হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ৯৪৬ কর্মকর্তা যুগ্ম সচিব হিসেবে কর্মরত। অনুমোদিত পদের চেয়ে ৪৪৪ কর্মকর্তা বেশি পদোন্নতি পেয়েছেন। তাদের অধিকাংশই আগের পদেই যুগ্ম সচিব হিসেবে কাজ করছেন। উপসচিবের অনুমোদিত পদ ১৪২৮টি। তার মধ্যে সুপারনিউমারারি পদ ৪৩০টি। সর্বশেষ ১১ নভেম্বর বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ২৯তম ব্যাচকে বিবেচনায় নিয়ে ১৭৮ জনকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে প্রশাসনে ১৭০২ কর্মকর্তা উপসচিব হিসেবে কর্মরত।

এ ছাড়া বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ১৮ ব্যাচকে বিবেচনায় নিয়ে অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতির প্রক্রিয়া চলছে। ১১ নভেম্বর প্রশাসন ছাড়া অন্যান্য ক্যাডারের (আদার্স ক্যাডারের) আরও ৬২ কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়। তিন ধাপেই অনুমোদিত পদের বেশি পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে সাবেক সচিব আবু আলম মো. শহীদ খান বলেন, পদোন্নতি পাওয়ার যোগ্য হলে তাদের তা দিতে হবে। তারা দেশের জন্য কাজ করেন, সুতরাং তাদের সময়মতো পদোন্নতি দিতে হবে। প্রশ্ন হচ্ছে, সময় নিয়ে। এই সময়ের পদোন্নতি জনমনে প্রশ্ন উঠতেই পারে। এই সময় এত কর্মকর্তার পদোন্নতি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দেওয়ার অভিযোগ কেউ কেউ করতেই পারেন। তবে তার ব্যক্তিগত মত হচ্ছে, পদোন্নতি সমস্যা নয়। সমস্যা সময়টা। তফসেলের আগে এত পদোন্নতি কেন?

সূত্র মতে, গত ৬ নভেম্বর পুলিশ ক্যাডারে অতিরিক্ত উপপুলিশ মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) পদে ১২ কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। একই তারিখে সুপারনিউমারারি অতিরিক্ত উপপুলিশ মহাপরিদর্শক পদে ১৪০ কর্মকর্তার পদোন্নতি হয়। আগে থেকে কর্মরত আছেন ১৪০ অতিরিক্ত উপপুলিশ মহাপরিদর্শক। সব মিলিয়ে বর্তমানে অতিরিক্ত উপপুলিশ মহাপরিদর্শক পদে ২৯২ কর্মকর্তা কর্মরত। অনুমোদিত অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক পদ হচ্ছে ২০০টি। পুলিশ সুপার (এসপি) অনুমোদিত পদ ৫৯৩টি। ৬ নভেম্বর সর্বশেষ ১৭৭ কর্মকর্তা পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতি পেয়েছেন। তার মধ্যে ২৭ জন কর্মকর্তার পদোন্নতি নিয়মিত। সুপারনিউমারারি পুলিশ সুপার পদে ১৫০ কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়। বর্তমানে দেশে ৬১৮ জন পুলিশ সুপার পদমর্যাদার কর্মকর্তা কর্মরত। এ ছাড়া সুপারনিউমারারি পদে কর্মরত ১৫০ জন। সর্বমোট পুলিশ সুপার পদমর্যাদার ৭৬৮ কর্মকর্তা কর্মরত। অপরদিকে ১২ নভেম্বর সহকারী পুলিশ সুপার থেকে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদে ৪৬ কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের অনুমোদিত পদ ১০০১টি। আজ বা কালের মধ্যে উপমহাপুলিশ পরিদর্শক (ডিআইজি) এবং অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক (অ্যাডিশনাল আইজি) পদে পদোন্নতি দেওয়া হবে। এর আগে ২৭ সেপ্টেম্বর বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের ৬৯০ জনকে সহকারী অধ্যাপক থেকে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদেরও অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য এসএসবির বিবেচনায় আনা হয়েছে।

এ বিষয়ে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার বলেছেন, ‘পদ শূন্য থাকলে এবং পদোন্নতি পাওয়ার যোগ্য কর্মকর্তা থাকলে তা দিতে কোনো সমস্যা নেই। এমনকি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরও যদি পদ থাকে এবং পদোন্নতি যোগ্য কর্মকর্তা থাকে তাকে পদোন্নতি দিতে হবে। কিন্তু পদ নেই তারপরও পদোন্নতি দেওয়া উচিত নয়। সুপারনিউমারারি পদে কখনও পদোন্নতি দেওয়া উচিত নয়।’

সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক একেএম শহীদুল হক বলেন, একই পদে দীর্ঘদিন চাকরির ফলে কর্মকর্তাদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা চলে আসে। প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা সুপারনিউমারারি পদে পদোন্নতি নিচ্ছেন। তাদের অনুকরণে পুলিশ ক্যাডারে পদোন্নতির জন্য সুপানিউমারারি পদ সৃজনের অনুমোদন চাওয়া হয়েছে। সরকার তা অনুমোদন দিয়েছে। সে কারণে সুপারনিউমারারি পদে পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, সময়টা নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জাতীয় নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকেন প্রশাসন, পুলিশ এবং শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা। গত কয়েক মাসে এই তিন ক্যাডারের বিভিন্ন পদে মোট ১৬০৮ কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এতে নতুন পদ পাওয়া সবাই খুশি হয়েছেন। ক্যাডার কর্মকর্তাদের হরহামেশা পদোন্নতি হওয়ায় মাঠপর্যায়ের ননক্যাডার কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে। পুলিশ প্রশাসনের ননক্যাডার কর্মকর্তাদের অনেকেই দীর্ঘদিন পদোন্নতিবঞ্চিত হওয়ায় তারা প্রকাশ্যে সরকারের কাছে পদোন্নতির দাবি তুলেছেন। এরই মধ্যে তারা পদোন্নতির দাবিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছেন। এখন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তারা সাক্ষাৎ করতে চাইছেন। একই ধরনের অসন্তোষ আছে অন্যান্য ধাপের ননক্যাডার কর্মকর্তাদের মধ্যেও।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অন্যান্য ক্যাডারের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, সুপারনিউমারারি পদোন্নতি দিতেই যদি হয় তাহলে শুধু প্রশাসন এবং পুলিশ ক্যাডারে কেন? অন্য সব ক্যাডারেও দেওয়া উচিত। জাতীয় নির্বাচনে তারা বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে বিধায় এ ধরনের পদোন্নতি। অন্য ক্যাডারের ক্ষেত্রে বৈষম্য দেখালে কর্মক্ষেত্রে তারাও আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন। বৈষম্য দূর করার ক্ষেত্রে সরকারপ্রধানকে বিশেষ বিবেচনায় আনা উচিত বলে তারা মন্তব্য করেন।