মো: সুমন, বান্দরবান প্রতিনিধি |
পুরাতন বছরকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছরকে বরণ করতে উৎসবমুখর পার্বত্য এলাকার আকাশে-বাতাসে ধ্বনিত হচ্ছে ত্রিপুরা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মনমাতানো এই সুমধুর গান। জনপ্রিয় এই গানের তালে তালে চলছে ত্রিপুরাদের ঐতিহ্যবাহী গরাইয়া নৃত্য। বান্দরবানসহ তিন পার্বত্য জেলার ত্রিপুরা অধ্যুষিত পাড়া-পল্লী-শহরজুড়ে চলছে গরাইয়া নৃত্য। একইভাবে চাকমা ও মারমা নৃগোষ্ঠীর মানুষও মেতে উঠেছে পাহাড়ের প্রাণের উৎসব বৈসাবিতে।
আজ রোববার (১২ এপ্রিল) ভোরে বান্দরবান সাঙ্গু নদীর চরে গঙ্গাদেবীর উদ্দেশ্যে নদীতে ফুল ভাসিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী তাদের প্রাণের উৎসব বৈসাবির আনুষ্ঠানিকতা শুরু করেছে। তিন পার্বত্য জেলা, বিশেষ করে বান্দরবান পার্বত্য জেলায় বাঙালি ছাড়াও ১১টি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে, যা দেশের অন্য কোনো জেলায় নেই। নানা জাতিসত্তার বৈচিত্রময় জীবনধারা ও সংস্কৃতির সম্মিলন এই উৎসবকে আরো অনেক বেশি আনন্দ ও খুশির বার্তার জোগায়।
তিনদিনব্যাপী চলবে বর্ষবিদায় ও বরণের এই বর্ণিল উৎসবের মূল পর্ব। পুরাতন বছরের সকল দুঃখ, কষ্ট, গ্লানি, হতাশা, লাঞ্ছনা, বঞ্চনা ও ব্যর্থতাকে আস্তাকুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলে সুখ, ভুলক্রুটি জন্য ক্ষমা প্রার্থনা চেয়ে শান্তি আর সমৃদ্ধির নতুন মনোবাসনায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী মহাধুমধামে উদ্যাপন করে বৈসাবি। পার্বত্য এলাকার ঐতিহ্যবাহী এই বৈসাবির আনন্দের ঝড় শুরু হয় এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ থেকেই।
১৯৮৫ সালে উপজাতীয় ছাত্রদের উদ্যোগে ত্রিপুরাদের বৈসু, মারমাদের সাংগ্রাই এবং চাকমাদের বিজু—এই তিন প্রধান ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বর্ষবিদায় ও বরণ উৎসবের নামের আদ্যাক্ষর দিয়ে বৈসাবি নামকরণ করা হয়। বাংলা বছরের শেষ মাস চৈত্রের শেষ দুই দিন এবং বছরের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখ এই তিন দিনব্যাপী নানা অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে বর্ষবিদায় ও বরণের সবচেয়ে বড় ঐতিহ্যবাহী উৎসব বৈসাবি উদ্যাপন করে উপজাতীয়রা। বৈসাবি শুধুমাত্র একটি উৎসবই নয়, এটি যুগ যুগ ধরে লালন করছে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও সংস্কৃতি। এই উৎসবে মানুষে মানুষে গড়ে উঠে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন। বৈসু: পার্বত্য এলাকার সনাতন ধর্মাবলম্বী ত্রিপুরা উপজাতীয়রা তিনটি ধাপে নানা অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে উদ্যাপন করে বৈসু। চৈত্রসংক্রান্তির পূর্বদিনকে বলা হয় হারি বৈসু। এই দিনে ত্রিপুরা উপজাতীয়রা আগত দিনের সুখ-শান্তি কামনায় সৃষ্টিকর্তার কাছে বিশেষ প্রার্থনা করে। এই দিনে নদী, মন্দির ও বিশেষ পবিত্র স্থানে বিধাতার উদ্দেশ্যে ফুল অর্পণ, ধূপ ও মঙ্গল প্রদীপ জ্বালানো হয়। একে অপরকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানায় আবালবৃদ্ধবনিতা। বছরের শেষ দিনটিকে বলা হয় বিসুমা বৈসু। এই দিনে ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের মানুষ হিংসা, বিদ্বেষ ও শত্রুতা ভুলে গিয়ে নতুনভাবে ভ্রাতৃত্ববন্ধনে আবদ্ধ হয়। কুচাই পানি (বিশেষ পবিত্র জল) ছিটিয়ে ঘরবাড়ি পবিত্র করে মহিলারা।
প্রত্যেকের বাড়িতে সামর্থ্য অনুযায়ী পিঠা, মিষ্টান্ন, পাঁচন ইত্যাদি মুখরোচক খাবারের আয়োজন করা হয়। শিশু, কিশোর-কিশোরী ও যুবক-যুবতীরা সুন্দর পোশাক পরে, সাজসজ্জা করে দল বেঁধে বাড়ি বাড়ি ঘুরে বেড়ায়। নববর্ষের দিনটি বিসিকাতাল নামে উদ্যাপন করা হয়।
এই দিনে মূলত নতুন বছরকে বরণ করা হয়। শস্য ও সম্পদের জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে বিশেষ প্রার্থনা করা হয়। যুবক-যুবতী, কিশোর-কিশোরী ও নবদম্পতিরাজ কলসিতে পানি ও ফুল নিয়ে মুরুব্বিদের গোসল করিয়ে আশীর্বাদ গ্রহণ করে।
সম্পাদক ও প্রকাশক : মো: জাকির হোসেন মোল্লা, নির্বাহী সম্পাদক : এনামুল হক মামুন, ৫২/৪ ছায়ানীড়, নিউ ইস্কাটন রোড, বাংলা মোটর, ঢাকা। ফোন : ০২-৪৮৩১০৭৮১, মোবাইল : ০১৬১১৬২০০০০, ই-মেইল : khaborbangladesh@gmail.com
© All rights reserved 2018-2026 khoborbangladesh.com