ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করে ভোটের মাঠে ফিরেছেন ৪২২ জন প্রার্থী। বিপরীতে আপিল করেও প্রার্থিতা ফিরে পাননি ২১২ জন। তবে আপিলে ব্যর্থ প্রার্থীরা চাইলে উচ্চ আদালতে যেতে পারবেন। উচ্চ আদালতের রায়ই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে। অর্থাৎ নির্বাচন কমিশনের আপিলে হারলেও প্রার্থিতার সুযোগ এখনও শেষ হয়ে যায়নি। আপিল শুনানি শেষে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বৈধ প্রার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২৬৭ জন। এতে প্রতি আসনে গড়ে প্রতিদ্বন্দ্বী থাকছেন ৭.৫৫ জন।
আপিল শুনানির শেষ দিন গতকাল রবিবার সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই শুনানিতে উপস্থিত ছিলেন চার নির্বাচন কমিশনার এবং নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের কর্মকর্তারা। শেষ দিনে ৬৫টি আপিলের শুনানি হয়। এর মধ্যে ২৩টি আবেদন মঞ্জুর, ৩৯টি নামঞ্জুর এবং ৩টি আবেদন অপেক্ষমাণ রাখা হয়। টানা ৯ দিনের আপিল শুনানি শেষে মোট ৪২২ জন প্রার্থী তাদের প্রার্থিতা ফিরে পান।
এর আগে যাচাই-বাছাইয়ে নির্বাচন কমিশন ৭২৩ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল করে। তাদের মধ্যে ৬৪৫ জন প্রার্থিতা ফিরে পেতে আপিল করেন। আপিলে হেরে যাওয়া ২১২ জন প্রার্থী এখন উচ্চ আদালতে যাওয়ার সুযোগ পাবেন। বর্তমানে ৩ জনের আবেদন কমিশনের বিবেচনায় অপেক্ষমাণ রয়েছে।
আপিল শুনানির শেষ দিনে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও ফেনী-৩ আসনের প্রার্থী আবদুল আউয়াল মিন্টু প্রার্থিতা ফিরে পান। তার বিরুদ্ধে দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগে মনোনয়ন বাতিলের আবেদন করেছিলেন একই আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. মোহাম্মদ ফখরুদ্দিন মানিক। একই দিনে বিএনপির দুই প্রার্থীর আপিল নামঞ্জুর করে নির্বাচন কমিশন। তারা হলেন চট্টগ্রাম-২
আসনের সারোয়ার আলমগীর ও কুমিল্লা-১০ আসনের আবদুল গফুর ভূঁইয়া। এর আগে শনিবার কুমিল্লা-৪ আসনের বিএনপি প্রার্থী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর মনোনয়নপত্র বাতিল করে ইসি। এ নিয়ে বিএনপির তিনজন প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর একজন প্রার্থী আপিলেও প্রার্থিতা ফিরে পাননি। চট্টগ্রাম-৯ আসনের প্রার্থী ডা. ফজলুল হকের আপিল আবেদন নামঞ্জুর করা হয়। আপিলে দলগতভাবে জাতীয় পার্টির (জাপা) সর্বোচ্চ ৪২ জন প্রার্থী প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন।
এদিকে আপিল শুনানিকে কেন্দ্র করে রবিবার সকাল থেকেই আগারগাঁও নির্বাচন কমিশন ভবনের অডিটোরিয়ামে রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে। এ দিন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া উপস্থিত ছিলেন। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলে আগারগাঁও এলাকায় বিক্ষোভ ও অবরোধের ঘটনা ঘটে। রবিবার ছিল আপিল শুনানির শেষ দিন।
এ দিন নির্বাচন কমিশনের বিশেষ বিবেচনায় খাগড়াছড়ি আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী জিরুনা ত্রিপুরা প্রার্থিতা ফিরে পান। নির্ধারিত এক শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর সংগ্রহে ব্যর্থ হওয়ায় রিটার্নিং কর্মকর্তা তার মনোনয়নপত্র বাতিল করেছিলেন। খাগড়াছড়ি আসনে তিনি একমাত্র নারী প্রার্থী। দুর্গম এলাকা হওয়ায় প্রয়োজনীয় স্বাক্ষর সংগ্রহে বাস্তব জটিলতা বিবেচনায় নিয়ে, ভোটার সমর্থনের ঘাটতি ৮৭ শতাংশ থাকলেও নির্বাচন কমিশন নিজস্ব ক্ষমতায় বিশেষ বিবেচনায় তার প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করে।
আপিল শুনানি শেষে আগামীকাল মঙ্গলবার মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন। পরদিন বুধবার চূড়ান্ত প্রার্থীদের মধ্যে প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হবে। প্রতীক বরাদ্দের পর বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হবে আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণা।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ ৫১টি দলের ২ হাজার ৯০ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দেন। পাশাপাশি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দেন ৪৭৮ জন। মোট প্রার্থীর সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৫৬৯ জন। তবে একটি সংগঠনের ব্যানারে মনোনয়ন জমা দেওয়ায় একজনের মনোনয়ন বাতিল হলে মোট প্রার্থীর সংখ্যা দাঁড়ায় ২ হাজার ৫৬৮ জন।
মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে বিভিন্ন ত্রুটির কারণে ৭২৩ জনের প্রার্থিতা বাতিল হয়। ফলে তখন বৈধ প্রার্থী ছিলেন ১ হাজার ৮৪৫ জন। রিটার্নিং কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মোট ৬৪৫টি আপিল আবেদন জমা পড়ে। টানা ৯ দিন শুনানি শেষে নির্বাচন কমিশন চূড়ান্তভাবে প্রার্থিতা ঘোষণা করে। এতে বৈধ প্রার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২৮৬ জন।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে লড়বেন ২৮৫ জন প্রার্থী। জামায়াতে ইসলামীর ১৭৯ জন, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ৩০ জন, জাতীয় পার্টির (জাপা) ২০৩ জন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ২৬৮ জন, সিপিবির নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্টের ১৫২ জন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ২০ জন, খেলাফত মজলিসের ১০ জন, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির ৩ জন, নেজামে ইসলামের ২ জন, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির ২ জন, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের ৫ জন, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের ১১ জন, বাংলাদেশ জাসদের ১৫ জন এবং জেএসডির ২৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। এ ছাড়াও অন্যান্য দলের প্রার্থীরা রয়েছেন।
সংশোধিত তফসিল অনুযায়ী আগামীকাল মঙ্গলবার মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন। ২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দ ও চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হবে। ২২ জানুয়ারি থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলবে নির্বাচনী প্রচারণা। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে।
এদিকে কুমিল্লা-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর মনোনয়নপত্র বাতিল করেছে ইসি। সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তা মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে বৈধ ঘোষণা করেছিলেন। রিটার্নিং কর্মকর্তার এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ইসিতে আপিল করেছিলেন এই আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি আপিলে অভিযোগ করেছিলেন, বিএনপির প্রার্থী ঋণখেলাপি হওয়ার তথ্য গোপন করে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। শুনানি শেষে আপিল মঞ্জুর করে ইসি। এতে মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর মনোনয়নপত্র অবৈধ হলো। এর আগে তিনি চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
চট্টগ্রাম-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী সারোয়ার আলমগীর। ঋণখেলাপি হওয়ায় তার মনোনয়নপত্র বৈধতার বিরুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর করা আপিল মঞ্জুর করেছে ইসি। এতে তার প্রার্থিতা বাতিল হয়।
কুমিল্লা-১০ আসনে বিএনপির প্রার্থী আবদুল গফুর ভুইয়ার মনোনয়নপত্র বাতিল করেছে ইসি। আবদুল গফুর ভুইয়া দ্বৈত নাগরিক বলে আপিলে অভিযোগ করা হয়। এর আগে ৮ম জাতীয় সংসদে কুমিল্লা-১০ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়েন এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন।
এ ছাড়া প্রার্থিতা ফিরে পেতে আপলি করলেও ঋণখেলাপির অভিযোগে যশোর-৪ আসনে বিএনপি প্রার্থী টিএস আইয়ুবের মনোনয়নপত্র নামঞ্জুর করেছে ইসি। গত ২ জানুয়ারি মনোনয়ন যাচাই-বাছাই করে ঋণখেলাপির দায়ে টিএস আইয়ুবের মনোনয়নপত্র অবৈধ ঘোষণা করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। এরপর প্রার্থিতা ফিরে পেতে তিনি ইসিতে আপিল করেছিলেন।
এদিকে চট্টগ্রাম-৯ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী একেএম ফজলুল হকের আপিল আবেদন নামঞ্জুর করেছে ইসি। দ্বৈত নাগরিকত্বের কারণে বাছাইয়ে জামায়াতের এই প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করেছিলেন সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তা। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তিনি ইসিতে আপিল করেন। আপিল শুনানি শেষে তার মনোনয়নপত্র অবৈধ বলে রায় দেয় ইসি।
ইসিতে আপিল করে বগুড়া-২ আসনে প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না। এর আগে বাছাইয়ে বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনে মাহমুদুর রহমান মান্নার মনোনয়নপত্র বাতিল করেছিলেন সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তা। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তিনি ইসিতে আপিল করেন। কক্সবাজার-২ আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী ও দলের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদের মনোনয়নপত্রকে বৈধ ঘোষণা করেছে ইসি। মামলা সংক্রান্ত কারণে হামিদুর রহমান আযাদের মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করেছিলেন রিটার্নিং কর্মকর্তা।
এ ছাড়া ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারার মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। মনোনয়নপত্রের সঙ্গে দাখিল করা ১ শতাংশ ভোটারের তালিকা নিয়ে গরমিলের কারণে এনসিপি থেকে পদত্যাগ করা তাসনিম জারার মনোনয়নপত্র বাতিল করেছিলেন রিটার্নিং কর্মকর্তা।
খবর বাংলাদেশ ডেস্ক : 

























