আয়নাল হক, গুরুদাসপুর (নাটোর) |
চলনবিলের বিস্তীর্ণ জলাভূমি ও ফসলি জমি কচুরিপানায় ঢেকে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন কৃষকেরা। নাটোরের গুরুদাসপুর ও সিংড়া উপজেলার বিলাঞ্চলের হাজার হাজার হেক্টর জমি এখন কচুরিপানার দখলে। এতে আমন, আগাম সরিষা, গম ও ইরি-বোরো চাষাবাদ নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, কচুরিপানার আগ্রাসনে প্রায় ৩০ হাজার কৃষক সরাসরি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। একই সঙ্গে জলপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকেরা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিগত কয়েকটি বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির পর এবার কচুরিপানার আগ্রাসনে নতুন করে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন বিলপারের মানুষ। গুরুদাসপুরের খুবজীপুর ইউনিয়নের বিলশা, শ্রীপুর, বামনবাড়িয়া ও পিপলা; বিয়াঘাট ইউনিয়নের বিলহরিবাড়ি, যোগেন্দ্রনগর ও মশিন্দা এলাকা এবং সিংড়া উপজেলার ডাহিয়া, ইতালী, চৌগ্রাম, কলম, তাজপুর ও শেরকোলসহ অন্তত ৩০টি গ্রামের বিল এলাকা কচুরিপানায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। চলতি বর্ষা মৌসুমে আমন ধান চাষ করতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন কৃষকেরা।
কৃষকেরা জানান, এক বিঘা জমির কচুরিপানা পরিষ্কার করতে ১০ থেকে ১২ জন শ্রমিক প্রয়োজন হচ্ছে। শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা। ফলে শুধু কচুরিপানা পরিষ্কার করতেই প্রতি বিঘা জমিতে অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে প্রায় ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা। অনেক কৃষক ঋণ নিয়ে জমি পরিষ্কারের চেষ্টা করলেও শ্রমিক সংকটের কারণে কাজ ব্যাহত হচ্ছে।
বিলশা গ্রামের কৃষক ফারুক হোসেন বলেন, ‘কচুরিপানা পরিষ্কার করতেই পকেটের হাজার হাজার টাকা শেষ। কয়েক বছর ধরে পরপর বন্যায় ক্ষতি হলেও কোনো কার্যকর সরকারি সহযোগিতা পাইনি। এখন টাকা দিলেও ঠিকমতো শ্রমিক মিলছে না।’
কৃষিজমির পাশাপাশি কচুরিপানার বিস্তারে চলনবিলের নৌপথও অচল হয়ে পড়েছে। প্রধান প্রধান নৌপথে কচুরিপানার জট তৈরি হওয়ায় স্বাভাবিক নৌযাতায়াত ব্যাহত হচ্ছে। এতে দিনমজুর ও নৌকার মাঝিরা কর্মহীন হয়ে পড়ছেন।
সাতপুকুরিয়া গ্রামের শিক্ষক টগর হোসেন বলেন, ‘যেসব পথে আগে সহজেই নৌকা চলাচল করত, এখন সেখানে কচুরিপানার জটে নৌকা চালানোই অসম্ভব হয়ে পড়েছে।’
চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এম এম আলী আককাছ বলেন, ‘চলনবিল দেশের খাদ্যশস্যের অন্যতম প্রধান ভান্ডার। এখানে আবাদ ব্যাহত হলে জাতীয় খাদ্য সরবরাহে চাপ পড়বে। এ ছাড়া কচুরিপানার কারণে জলজ জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে এবং পানিবাহিত নানা রোগ ছড়াচ্ছে।’
খুবজীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মনিরুল ইসলাম দোলন বলেন, সিংড়া থেকে চাটমোহর পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকা এখন কচুরিপানার নিচে। দ্রুত সরকারি উদ্যোগে কচুরিপানা অপসারণ করা না হলে বিলের কৃষি অর্থনীতি ভেঙে পড়বে।
গুরুদাসপুর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা কে. এম. রাফিউল ইসলাম বলেন, বিলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ কম থাকা এবং বিভিন্ন স্থানে অবৈধ বাঁধ বা সুতিজাল দেওয়ার কারণে কচুরিপানা আটকে এই জটের সৃষ্টি হয়েছে। কৃষকদের জমি পরিষ্কারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
গুরুদাসপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাহমিদা আফরোজ বলেন, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে কৃষি বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরেজমিনে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
প্রিন্ট
খবর বাংলাদেশ ডেস্ক : 




















