ঢাকা ০৬:১৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ২৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :
কালিহাতীতে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে ‘তারুণ্যের কণ্ঠ’ অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় ভারত, মালয়েশিয়া ও শ্রীলংকাকে হারিয়ে রানার-আপ গাকৃবির ‘কার্বোডিট’ বরগুনার আমতলীতে ইয়াবাসহ দুই মাদক কারবারি গ্রেফতার মাদক ও হানি ট্র্যাপের বিরুদ্ধে ডিবির বড় সফলতা: ২৪ ঘণ্টায় আটক ৭ সিরাজদিখানে আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস উদযাপন কাঠ পাচারের তথ্য চাইতেই রাজনৈতিক পরিচয় বন কর্মকর্তার, সাংবাদিককে নেতার ফোন নরসিংদীতে চাকরি দেওয়ার প্রলোভনে মাদ্রাসা সুপারের বিরুদ্ধে লাখ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ জামায়াত-ফ্যাসিস্ট চক্রের যোগসাজশে গভীর চক্রান্ত! দারুস সালামে চাঁদাবাজির অভিযোগে অর্থদণ্ড, পুলিশের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ! উপ-সচিবের ভাই ফারুক আহমেদকে সার ডিলার নিয়োগ, স্বজনপ্রীতির অভিযোগ

কাঠ পাচারের তথ্য চাইতেই রাজনৈতিক পরিচয় বন কর্মকর্তার, সাংবাদিককে নেতার ফোন

মো: সুমন, বান্দরবান প্রতিনিধি |
বান্দরবানের চেমি রেঞ্জে গাছ কাটা ও কাঠ পাচারের অভিযোগ নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে এক বন কর্মকর্তার রাজনৈতিক পরিচয় দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এর কিছু সময় পরই এক রাজনৈতিক নেতা সংশ্লিষ্ট সাংবাদিককে ফোন করে ওই কর্মকর্তার বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়ার কারণ জানতে চান। পরে কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ না করারও অনুরোধ জানানো হয়।

অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন বন বিভাগের পাল্পউড প্ল্যান্টেশন শাখার চেমি রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. আমজাদ হোসেন। তিনি বান্দরবান সদর উপজেলার কুহালং ইউনিয়নে অবস্থিত চেমি রেঞ্জের দায়িত্ব পালন করছেন।

এদিকে চেমি রেঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় দিনের আলোতে মূল্যবান গাছ কাটা ও কাঠ পরিবহনের অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বন বিভাগের কার্যালয়ের কাছেও কাটা গাছ পড়ে থাকতে দেখা গেছে।
তথ্য চাইতেই রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রসঙ্গ
চেমি রেঞ্জে গাছ কাটা ও কাঠ পাচারের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. আমজাদ হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এই প্রতিবেদক।

প্রতিবেদকের অভিযোগ, বন বিভাগের কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে ওই কর্মকর্তা নিজেকে একটি রাজনৈতিক দলের কর্মী হিসেবে পরিচয় দেন। সরকারি দায়িত্ব ও বনাঞ্চলের নিরাপত্তাসংক্রান্ত প্রশ্নের মধ্যে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় তুলে ধরার বিষয়টি অপ্রত্যাশিত ছিল।

এরপর বান্দরবান পৌর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক পরিচয়ে এক ব্যক্তি প্রতিবেদককে ফোন করেন। তিনি চেমি রেঞ্জ কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের কারণ জানতে চান। পরবর্তী সময়ে ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ না করার অনুরোধও জানানো হয়।

প্রতিবেদকের দাবি, কাঠ পাচারের অভিযোগ নিয়ে অনুসন্ধানের মধ্যেই রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে তাঁর ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা হয়েছে।

এ বিষয়ে রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. আমজাদ হোসেনের বক্তব্যে জনবলসংকট ও দায়িত্ব পালনের সীমাবদ্ধতার কথা উঠে এলেও রাজনৈতিক পরিচয় দেওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে তাঁর সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

কার্যালয়ের কাছেই কাটা গাছ, নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন
বান্দরবান সদর উপজেলার কুহালং ইউনিয়নে বন বিভাগের পাল্পউড প্ল্যান্টেশন শাখার অধীন চেমি রেঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে গাছ কাটার অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, বন বিভাগের কার্যকর নজরদারির অভাবে পাহাড়ি এলাকার বিভিন্ন স্থানে সেগুন, মেহগনিসহ মূল্যবান গাছ কাটা হচ্ছে। পরে এসব কাঠ বিভিন্ন স’মিল ও ইটভাটায় সরবরাহ করা হচ্ছে।

সরেজমিনে চেমি রেঞ্জ কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, কার্যালয়ের অবকাঠামো জরাজীর্ণ। আশপাশেও অযত্নের ছাপ রয়েছে। পরিদর্শনের সময় কার্যালয়ে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীকে পাওয়া যায়নি।
কার্যালয় থেকে আনুমানিক ১০০ গজের মধ্যে বিভিন্ন স্থানে কাটা গাছ পড়ে থাকতে দেখা যায়।এ বিষয়ে রেঞ্জ কর্মকর্তাকে জানালেও কোন ধরনের ব্যবস্থা নেয়নি।
তাঁদের আশঙ্কা, কার্যালয়ের আশপাশেই নজরদারির ঘাটতি থাকলে দুর্গম পাহাড়ি বনাঞ্চলের মূল্যবান গাছ রক্ষা করা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

চেমির কাঠ যাচ্ছে কোথায়
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চেমি রেঞ্জের আওতাধীন কেয়ামলং, চেমি ডলুপাড়া, গুংগুরু মুখপাড়া, আমতলীপাড়া, বটতলী ও গলাচিপাসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় গাছ কাটার অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, এসব এলাকা থেকে কাঠ সংগ্রহ করে ডলুপাড়া বাজার হয়ে ১০ মাইল, বাঙ্গাহালী ও রাজস্থলীসহ বিভিন্ন এলাকায় পরিবহন করা হচ্ছে।
পাহাড়ি সড়ক ও বিভিন্ন বিকল্প পথ ব্যবহার করে কাঠ স’মিল এবং ইটভাটায় পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া বান্দরবানের স্বর্ণমন্দিরে যাওয়ার পথের বিভিন্ন স্থানে বড় আকারের সেগুনগাছের কাটা অংশ পড়ে থাকার তথ্য দিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
অভিযোগ রয়েছে, পরিবহন করা এসব কাঠের একটি অংশের বৈধ ট্রানজিট পাস (টিপি) নেই।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, বন বিভাগের নিয়মিত অভিযান ও কাঠ পরিবহনের অনুমতিপত্র যাচাই জোরদার করা প্রয়োজন। অন্যথায় পাহাড়ের বনজ সম্পদ আরও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
‘দুইজন স্টাফ দিয়ে পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণ কঠিন’
গাছ কাটা ও কাঠ পাচারের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে চেমি রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. আমজাদ হোসেন জনবলসংকটের কথা জানান।
তিনি বলেন, ‘আমি নতুন দায়িত্ব নিয়েছি। রেঞ্জে মাত্র দুইজন স্টাফ রয়েছে। এত কম জনবল দিয়ে পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।’
ওই কর্মকর্তা জানান, দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অভিযান পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি যানবাহনও নেই। কাঠ পাচারের খবর পেলে অনেক সময় ভাড়া করা মোটরসাইকেলে ঘটনাস্থলে যেতে হয়।
তাঁর দাবি, সীমিত জনবল ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাব সত্ত্বেও কাঠ পাচার নিয়ন্ত্রণে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সদর রেঞ্জের অতিরিক্ত দায়িত্বও পালন করায় মো. আমজাদ হোসেন চেমি রেঞ্জে নিয়মিত অবস্থান করতে পারেন না। এতে মাঠপর্যায়ে নজরদারির ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।
তবে জনবলসংকটের পাশাপাশি বন বিভাগের নিয়মিত তদারকি ও অভিযানের বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
তাঁরা জানতে চান, চেমি রেঞ্জে সম্প্রতি কতটি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে, কত পরিমাণ অবৈধ কাঠ জব্দ হয়েছে এবং গাছ কাটার অভিযোগে কারও বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না।
সরকারি কর্মকর্তার রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন
বনাঞ্চল রক্ষা, অবৈধ গাছ কাটা প্রতিরোধ এবং কাঠ পরিবহনের বৈধতা যাচাই বন বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
এমন দায়িত্বে থাকা একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সংবাদ সংগ্রহের সময় রাজনৈতিক পরিচয় তুলে ধরার অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে বন বিভাগের কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য চাওয়ার পর রাজনৈতিক নেতার পরিচয়ে সাংবাদিককে ফোন করার ঘটনা স্বাধীনভাবে সংবাদ সংগ্রহের পরিবেশ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি করেছে।
‘কাঠ পাচারে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না’
চেমি রেঞ্জে গাছ কাটা ও কাঠ পাচারের অভিযোগ সম্পর্কে বন বিভাগের পাল্পউড প্ল্যান্টেশন বান্দরবান বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) আবু ইউসুফের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।
তিনি অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখার আশ্বাস দেন।
আবু ইউসুফ বলেন, ‘রেঞ্জ কর্মকর্তার সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলছি। সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে অবশ্যই অভিযান পরিচালনা করা হবে। কাঠ পাচারের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।’
তবে চেমি রেঞ্জ কর্মকর্তার রাজনৈতিক পরিচয় দেওয়া এবং সাংবাদিককে রাজনৈতিক নেতার ফোন করার অভিযোগের বিষয়ে বিভাগীয় পর্যায়ে কোনো তদন্ত হবে কি না, তা জানা যায়নি।


প্রিন্ট
ট্যাগস
জনপ্রিয় সংবাদ

কালিহাতীতে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে ‘তারুণ্যের কণ্ঠ’ অনুষ্ঠিত

কাঠ পাচারের তথ্য চাইতেই রাজনৈতিক পরিচয় বন কর্মকর্তার, সাংবাদিককে নেতার ফোন

আপডেট টাইম : ১১:৩৭:৩৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬

মো: সুমন, বান্দরবান প্রতিনিধি |
বান্দরবানের চেমি রেঞ্জে গাছ কাটা ও কাঠ পাচারের অভিযোগ নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে এক বন কর্মকর্তার রাজনৈতিক পরিচয় দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এর কিছু সময় পরই এক রাজনৈতিক নেতা সংশ্লিষ্ট সাংবাদিককে ফোন করে ওই কর্মকর্তার বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়ার কারণ জানতে চান। পরে কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ না করারও অনুরোধ জানানো হয়।

অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন বন বিভাগের পাল্পউড প্ল্যান্টেশন শাখার চেমি রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. আমজাদ হোসেন। তিনি বান্দরবান সদর উপজেলার কুহালং ইউনিয়নে অবস্থিত চেমি রেঞ্জের দায়িত্ব পালন করছেন।

এদিকে চেমি রেঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় দিনের আলোতে মূল্যবান গাছ কাটা ও কাঠ পরিবহনের অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বন বিভাগের কার্যালয়ের কাছেও কাটা গাছ পড়ে থাকতে দেখা গেছে।
তথ্য চাইতেই রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রসঙ্গ
চেমি রেঞ্জে গাছ কাটা ও কাঠ পাচারের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. আমজাদ হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এই প্রতিবেদক।

প্রতিবেদকের অভিযোগ, বন বিভাগের কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে ওই কর্মকর্তা নিজেকে একটি রাজনৈতিক দলের কর্মী হিসেবে পরিচয় দেন। সরকারি দায়িত্ব ও বনাঞ্চলের নিরাপত্তাসংক্রান্ত প্রশ্নের মধ্যে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় তুলে ধরার বিষয়টি অপ্রত্যাশিত ছিল।

এরপর বান্দরবান পৌর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক পরিচয়ে এক ব্যক্তি প্রতিবেদককে ফোন করেন। তিনি চেমি রেঞ্জ কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের কারণ জানতে চান। পরবর্তী সময়ে ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ না করার অনুরোধও জানানো হয়।

প্রতিবেদকের দাবি, কাঠ পাচারের অভিযোগ নিয়ে অনুসন্ধানের মধ্যেই রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে তাঁর ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা হয়েছে।

এ বিষয়ে রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. আমজাদ হোসেনের বক্তব্যে জনবলসংকট ও দায়িত্ব পালনের সীমাবদ্ধতার কথা উঠে এলেও রাজনৈতিক পরিচয় দেওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে তাঁর সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

কার্যালয়ের কাছেই কাটা গাছ, নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন
বান্দরবান সদর উপজেলার কুহালং ইউনিয়নে বন বিভাগের পাল্পউড প্ল্যান্টেশন শাখার অধীন চেমি রেঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে গাছ কাটার অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, বন বিভাগের কার্যকর নজরদারির অভাবে পাহাড়ি এলাকার বিভিন্ন স্থানে সেগুন, মেহগনিসহ মূল্যবান গাছ কাটা হচ্ছে। পরে এসব কাঠ বিভিন্ন স’মিল ও ইটভাটায় সরবরাহ করা হচ্ছে।

সরেজমিনে চেমি রেঞ্জ কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, কার্যালয়ের অবকাঠামো জরাজীর্ণ। আশপাশেও অযত্নের ছাপ রয়েছে। পরিদর্শনের সময় কার্যালয়ে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীকে পাওয়া যায়নি।
কার্যালয় থেকে আনুমানিক ১০০ গজের মধ্যে বিভিন্ন স্থানে কাটা গাছ পড়ে থাকতে দেখা যায়।এ বিষয়ে রেঞ্জ কর্মকর্তাকে জানালেও কোন ধরনের ব্যবস্থা নেয়নি।
তাঁদের আশঙ্কা, কার্যালয়ের আশপাশেই নজরদারির ঘাটতি থাকলে দুর্গম পাহাড়ি বনাঞ্চলের মূল্যবান গাছ রক্ষা করা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

চেমির কাঠ যাচ্ছে কোথায়
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চেমি রেঞ্জের আওতাধীন কেয়ামলং, চেমি ডলুপাড়া, গুংগুরু মুখপাড়া, আমতলীপাড়া, বটতলী ও গলাচিপাসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় গাছ কাটার অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, এসব এলাকা থেকে কাঠ সংগ্রহ করে ডলুপাড়া বাজার হয়ে ১০ মাইল, বাঙ্গাহালী ও রাজস্থলীসহ বিভিন্ন এলাকায় পরিবহন করা হচ্ছে।
পাহাড়ি সড়ক ও বিভিন্ন বিকল্প পথ ব্যবহার করে কাঠ স’মিল এবং ইটভাটায় পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া বান্দরবানের স্বর্ণমন্দিরে যাওয়ার পথের বিভিন্ন স্থানে বড় আকারের সেগুনগাছের কাটা অংশ পড়ে থাকার তথ্য দিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
অভিযোগ রয়েছে, পরিবহন করা এসব কাঠের একটি অংশের বৈধ ট্রানজিট পাস (টিপি) নেই।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, বন বিভাগের নিয়মিত অভিযান ও কাঠ পরিবহনের অনুমতিপত্র যাচাই জোরদার করা প্রয়োজন। অন্যথায় পাহাড়ের বনজ সম্পদ আরও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
‘দুইজন স্টাফ দিয়ে পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণ কঠিন’
গাছ কাটা ও কাঠ পাচারের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে চেমি রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. আমজাদ হোসেন জনবলসংকটের কথা জানান।
তিনি বলেন, ‘আমি নতুন দায়িত্ব নিয়েছি। রেঞ্জে মাত্র দুইজন স্টাফ রয়েছে। এত কম জনবল দিয়ে পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।’
ওই কর্মকর্তা জানান, দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অভিযান পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি যানবাহনও নেই। কাঠ পাচারের খবর পেলে অনেক সময় ভাড়া করা মোটরসাইকেলে ঘটনাস্থলে যেতে হয়।
তাঁর দাবি, সীমিত জনবল ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাব সত্ত্বেও কাঠ পাচার নিয়ন্ত্রণে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সদর রেঞ্জের অতিরিক্ত দায়িত্বও পালন করায় মো. আমজাদ হোসেন চেমি রেঞ্জে নিয়মিত অবস্থান করতে পারেন না। এতে মাঠপর্যায়ে নজরদারির ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।
তবে জনবলসংকটের পাশাপাশি বন বিভাগের নিয়মিত তদারকি ও অভিযানের বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
তাঁরা জানতে চান, চেমি রেঞ্জে সম্প্রতি কতটি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে, কত পরিমাণ অবৈধ কাঠ জব্দ হয়েছে এবং গাছ কাটার অভিযোগে কারও বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না।
সরকারি কর্মকর্তার রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন
বনাঞ্চল রক্ষা, অবৈধ গাছ কাটা প্রতিরোধ এবং কাঠ পরিবহনের বৈধতা যাচাই বন বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
এমন দায়িত্বে থাকা একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সংবাদ সংগ্রহের সময় রাজনৈতিক পরিচয় তুলে ধরার অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে বন বিভাগের কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য চাওয়ার পর রাজনৈতিক নেতার পরিচয়ে সাংবাদিককে ফোন করার ঘটনা স্বাধীনভাবে সংবাদ সংগ্রহের পরিবেশ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি করেছে।
‘কাঠ পাচারে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না’
চেমি রেঞ্জে গাছ কাটা ও কাঠ পাচারের অভিযোগ সম্পর্কে বন বিভাগের পাল্পউড প্ল্যান্টেশন বান্দরবান বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) আবু ইউসুফের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।
তিনি অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখার আশ্বাস দেন।
আবু ইউসুফ বলেন, ‘রেঞ্জ কর্মকর্তার সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলছি। সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে অবশ্যই অভিযান পরিচালনা করা হবে। কাঠ পাচারের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।’
তবে চেমি রেঞ্জ কর্মকর্তার রাজনৈতিক পরিচয় দেওয়া এবং সাংবাদিককে রাজনৈতিক নেতার ফোন করার অভিযোগের বিষয়ে বিভাগীয় পর্যায়ে কোনো তদন্ত হবে কি না, তা জানা যায়নি।


প্রিন্ট